আমিনুল ইসলাম আহাদঃ শহর থেকে গ্রামীণ পলিটিক্স আজ যেন এক অব্যবস্থার নাম, এক অচল সিস্টেমের প্রতীক। এক সময় যে গ্রামগুলো ছিল শান্তি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ঠিকানা, আজ সেখানে সামান্য হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল বা গাছ-জমির সীমান্ত নিয়েই দেখা দেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। চুল থেকে চুন কেশলেই সৃষ্টি হয় মহামারীর মতো ঝগড়া, যার আগুন ছড়িয়ে পড়ে কোর্ট-কাছারির বারান্দা পর্যন্ত।
একটি ছোট জমি নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ পরিণত হয় মামলায়, মামলা থেকে হয় হুমকি-ধামকি, এরপর শুরু হয় অন্তহীন ভোগান্তি। গ্রামের সরল মানুষগুলো নিজেদের না বুঝেই জড়িয়ে পড়ে আইনি ফাঁদে। যারা একসময় হালচাষ করত, মাছ ধরত, তারা এখন আদালতের দালানচূড়ায় বাবুদের পেছনে ঘুরছে; কেউ জব্দ হয়ে যায়, কেউ প্রতিশোধের খোঁজে হারিয়ে ফেলে নিজের শান্তি ও সততা।
গ্রামের চুকুল-গুড় মানুষগুলো আজ শহরের আদালতে ঘুরে বেড়ায় মামলার তারিখের আশায়। আগে যে মানুষগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কৃষিকাজ করত, এখন তারা বিভক্ত— একপক্ষ মামলার বাদী, আরেকপক্ষ বিবাদী। সম্পর্কের উষ্ণতা আজ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে কাগজের নোটিশে।
শহরের আদালতের বারান্দায় সেই গ্রামীণ মুখগুলোতে এখন ক্লান্তি, হতাশা ও পরাজয়ের ছাপ। একসময় গ্রামের আত্মীয়তার বন্ধন ছিল শক্ত; এখন সেটি টিকিয়ে রাখার চেয়ে মামলা জেতাই বড় বিষয়। শহরের আইনজীবী আর দালালদের পকেটে এখন জমে গ্রামের ঘাম, মাটি, আর চোখের জল।
গ্রামের যে মোড়লরা একসময় ছিলেন সমাজের বিবেক, তারাই আজ অন্যায়ের কারিগর। সালিশ-দরবার এখন ন্যায়ের জায়গা নয়, বরং অর্থ ও প্রভাবের খেলাঘর। ঘুষের বিনিময়ে দেওয়া হয় রায়, ন্যায়বিচারের নামে চলে বাণিজ্য। যার হাতে ক্ষমতা, তার দিকেই ঝুঁকে যায় বিচারের পাল্লা।
এমন সালিশের নামে সাধারণ মানুষ আরও নিঃস্ব হয়। কেউ হয় হয়রানির শিকার, কেউ সমাজচ্যুত। সত্যের মুখ চেপে দেওয়া হয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইচ্ছায়। গ্রামের এই অন্যায়ের পরিবেশে সততার মানুষগুলো টিকতে পারে না, বাধ্য হয় গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে।
আজ গ্রামের চিত্র যেন উল্টে গেছে। ভদ্র, শিক্ষিত ও নীতিবান মানুষগুলো গ্রামে থাকলে তাকে বলা হয় দুর্বল। তার সততা হয় উপহাসের বিষয়। যিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তাকেই করা হয় হুমকি, মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। একসময় যে গ্রামে অতিথিপরায়ণতা ছিল গর্বের, সেখানে এখন শত্রুতা গড়ে ওঠে হাসি বা শুভেচ্ছা বিনিময় নিয়েও।
এই বাস্তবতায় গ্রামের অনেক সচেতন মানুষ সন্তানদের শিক্ষার ভবিষ্যৎ আর কিছুটা শান্তির আশায় শহরে পাড়ি জমায়। কিন্তু শহরে গিয়েও শান্তি নেই— গ্রামীণ রাজনীতির বিষাক্ত ছায়া শহরের রাজপথেও ছড়িয়ে পড়েছে। দলীয় প্রভাব, টেন্ডারবাজি, আর প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সেই একই চিত্র: ক্ষমতা, প্রভাব আর অন্যায়ের হাতছানি।
গ্রামীণ রাজনীতি এখন আর জনগণের সেবা নয়, বরং প্রভাব ও দখলবাজির লড়াই। এক সময় মানুষ ভোট দিত বিশ্বাস থেকে, এখন ভোট মানে শক্তি প্রদর্শন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বা সামান্য চেয়ারম্যান পদ নিয়েও গ্রাম ভরে যায় বিভাজনে। চায়ের দোকানে রাজনৈতিক আলোচনা মানেই এখন গালাগাল, হুমকি ও পক্ষ-বিপক্ষের সংঘর্ষ।
মাতব্বরদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায় কিছু সুবিধাভোগী, যারা সাধারণ মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে। সালিশ মানেই সেখানে একপক্ষের জয়, আরেকপক্ষের পরাজয়। নিরীহ মানুষটি ভাবত, সালিশ মানেই ন্যায়বিচার— কিন্তু আজ সেখানে বিক্রি হয় বিবেক, চলে ক্ষমতার বাণিজ্য।
এমন গ্রামীণ বাস্তবতায় ন্যায়বিচার এখন বিলাসিতা। আদালত মানেই বছরের পর বছর অপেক্ষা, কোর্টের বারান্দায় চোখে জল, পকেটে শূন্যতা। অন্যদিকে প্রভাবশালীরা টাকার জোরে পার পেয়ে যায়। গ্রামীণ সমাজে আজ এমন অবস্থা যে, সত্য বলার সাহসও যেন অপরাধ।
সাধারণ মানুষ একদিকে রাজনৈতিক প্রভাব, অন্যদিকে মোড়লদের অত্যাচারে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। জমি হারাচ্ছে, সম্মান হারাচ্ছে, আর হারাচ্ছে নিজেদের ভরসার জায়গাগুলো।
গ্রামের এই নোংরা রাজনীতি এখন শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। যারা শহরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চায়, তারাও পাচ্ছে না মুক্তি। রাজনৈতিক দাপট, প্রতিপক্ষ দমন, আর গোষ্ঠীগত আধিপত্য শহরের রাজপথে এনে দিয়েছে নতুন অস্থিরতা।
গ্রামীণ সমাজে যে বিষ বোনা হয়, সেটিই শহরে গিয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠে। ফলে সমাজের সর্বত্র এখন রাজনীতির নামে নৈরাজ্যের বিস্তার— যেখানে ন্যায়বিচার, মানবিকতা, আর সততা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
গ্রামের মানুষ আজও স্বপ্ন দেখে শান্তির, ন্যায়ের এবং সম্মানের সমাজের। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দরকার সচেতনতা ও শিক্ষার প্রসার। দরকার নৈতিক নেতৃত্ব, দরকার ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি।
গ্রামীণ রাজনীতি যদি জনগণের কল্যাণে না ফেরে, তবে সমাজ আরও বিপর্যয়ের দিকে যাবে। আজ সময় এসেছে— মোড়লদের ঘুষের রাজনীতি, সালিশের অন্যায় আর প্রভাবশালীদের দমননীতির বিরুদ্ধে গ্রামের সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।
গ্রাম মানে কেবল মাটি নয়, মানে আমাদের শিকড়। সেই শিকড়কে রক্ষা করতে হলে দরকার ন্যায়, সততা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার রাজনীতি। তাহলেই একদিন হয়তো আবার গ্রামীণ রাজনীতি ফিরে পাবে তার হারানো মর্যাদা— ন্যায়ের, সত্যের এবং মানবতার রাজনীতি।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত