পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে খাগড়াছড়ি শহরের পানখাইয়া পাড়াস্থ মারমা উন্নয়ন সংসদ কমিউনিটি সেন্টারে এক বিশাল গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল "পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলুন"। সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রীতি খীসা স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা। তিনি তার বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে চলমান ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং জনগণকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন।
সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, "পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ২৫টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে, ১৮টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ২৯টি ধারা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না করেই তারা চুক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছে।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, "অথচ আওয়ামী লীগ সরকার শান্তির শোভাযাত্রা ও কনসার্টের মাধ্যমে চুক্তির বর্ষপূর্তি উদযাপন করেছিল, কিন্তু চুক্তির মূল লক্ষ্য পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।"

তিনি পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন সংক্রান্ত কিছু উদাহরণ তুলে ধরেন, যেমন খাগড়াছড়ির প্রাক্তন সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা পার্বত্য চুক্তির ফলস্বরূপ প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করলেও চুক্তির মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, "পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ষড়যন্ত্র চলছে। সরকার আমাদের সঙ্গে বেঈমানী করেছে এবং মীর জাফরের মতো আচরণ করেছে। বিগত দিনে প্রাক্তন পাহাড়ি সংসদ সদস্যদের ভূমিকা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলরা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে নিজেদের স্বার্থে কাজ করেছেন।’"
তিনি আরও দাবি করেন, যে সকল রাজনৈতিক নেতারা চুক্তি বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাদের অনেকেই জনগণের প্রতি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন এবং নিজেদের স্বার্থে চুক্তির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন আটকে রেখেছেন।
"পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে আত্মত্যাগ করেও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন অর্জন করতে হবে।" বলে মন্তব্য করেন সুধাকর ত্রিপুরা।
পার্বত্য চুক্তির ২৭তম বর্ষপূর্তির এই সমাবেশে অন্য বক্তারা বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। ইউপিডিএফ -গণতান্ত্রিক’ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিটন চাকমা, উপজাতীয় শরনার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল, এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কাকলী খীসা সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা বলেন, "চুক্তির বাতিল করার জন্য শক্তিশালী ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।" তারা আরও বলেন, "বহু লোক ভীতি বা প্রলোভনে পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে গেছে। অনেকেই জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে।"
এই সমাবেশে বক্তারা দাবি করেন, "পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।" তারা আশা প্রকাশ করেন যে, বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে দেশের সংস্কারে কাজ করলে পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (চঈঔঝঝ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সুভাষ কান্তি চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভা দেশব্যাপী এবং আন্তর্জাতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির গুরুত্ব ও এর বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার সূচনা করেছে।
বক্তারা সবাইকে একসাথে মিলিত হয়ে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও চুক্তির বিষয়টি দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একত্রিত হতে আহ্বান জানান। তারা বলেন, "যতদিন না পার্বত্য চুক্তির প্রতিটি ধারা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়, ততদিন আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।"
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত