মো.সাহিদুল ইসলাম শাহীনঃ- ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় একটি দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা অর্জন করি চূড়ান্ত বিজয় এবং আমরা পাই একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বিজয় দিবসের এই দিনে ড.ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার সারাদেশের মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের শান্তি ও অগ্রগতির জন্য বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনার আয়োজন করে।
হাসপাতাল, জেলখানা, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা, পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, শিশু বিকাশ কেন্দ্র ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়। জেলা-উপজেলায় স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ক্রীড়া অনুষ্ঠান, ফুটবল, টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট, কাবাডি, হাডুডু প্রভৃতি খেলা।
ব্যতিক্রম হয়নি যশোর জেলার শার্শা উপজেলাতে। বিজয় দিবস'কে প্রাণবন্ত করতে ১৬-১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনদিন ব্যাপি নানা কর্মসূচি নিয়ে বিজয় উৎসবের মালা সাজিয়েছে শার্শা উপজেলা প্রশাসন। এ উপলক্ষে সর্বমহলে বিজয় শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন শার্শার নবাগত নির্বাহী অফিসার(ইউএনও) ফজলে ওয়াহিদ।
কর্মসূচি'র মধ্যে ছিল ১৪ ডিসেম্বর যথাযোগ্য মর্যাদায় শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস পালণ এবং ১৬ ডিসেম্বর বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিজয় দিবস উদযাপণ।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর(বিজয় দিবস) এর শুভসূচনা ঘটানো হয় এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়,বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ নুর মোহাম্মাদ শেখ এর সমাধীতে পুস্পস্তবক অর্পণ,কাগজপুকুর স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ,শার্শা উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলণ,জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন,কুচকাওয়াজ এবং বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে প্রদর্শণ করা হয়।
এ ছাড়াও ৩ দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে-উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিজয় মেলা,বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মানে সংবর্ধনা,প্রীতি ফুটবল ম্যাচ,শিশুদের অংশ গ্রহণে মুক্তযুদ্ধভিত্তিক রচনা,আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগীতা,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,হাসপাতাল,বৃদ্ধাশ্রম,এতিমখানা,শিশু পরিবার ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠান সমূহে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন,মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত/প্রার্থনা,উপজেলাধীন সকল সরকারী/বেসরকারী বিনোদনমূলক স্থান শিশুদের জন্য সকাল-সন্ধ্যা উন্মুক্ত রাখা এবং বিনা টিকিটে প্রদর্শন এবং উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন এবং উন্মুক্ত স্থান সমূহে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনী।
প্রশাসনের সকল কর্মসূচি সফল করার লক্ষে আইন শৃঙ্খলার কাজে সহায়তা করেন শার্শা থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ(ওসি) মো.ফারুখ হোসেন এবং বেনাপোল পোর্টথানার ওসি(তদন্ত) শেখ আব্দুল হাই। এ ছাড়াও আনসার/ভিডিবি সহ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি)'র কর্মকর্তারাও এ সকল কর্মসূচিতে অংশ নেন।
অপরদিকে,প্রশাসনের পাশাপাশি উৎসাহ,উদ্দীপনায় নানা কর্মসূচি দিয়ে বিজয় উদযাপণ করেছে অত্র উপজেলার বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল। বীর শ্রেষ্ঠ শেখ নুর মোহাম্মাদের সমাধীতে পুস্পস্তবক অর্পণ,কাগজপুকুর স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ সহ বর্ণাঢ্য র্যালি ' র আয়োজন করে বিএনপি।
তবে,শার্শা উপজেলা বিএনপি'র উপদেষ্ঠা- খায়রুজ্জামান মধু, সভাপতি-আবুল হাসান জহির এবং সাধারণ সম্পাদক-নুরুজ্জামান লিটন একত্রে কর্মসূচি পালণ করে। অপরদিকে,ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে "ধানের শীষ" মার্কার মনোনিত প্রার্থী বিএনপি'র কেন্দ্রীয় কমিটি'র সাবেক দপ্তর সম্পাদক এবং শার্শার সাবেক সাংসদ মফিকুল হাসান তৃপ্তি'কে আলাদাভাবে একক নেতৃত্বে কর্মসূচি পালণ করতে দেখা যায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্যঃ ১৯৭১'র মহান মুক্তিযুদ্ধে অক্টোবর মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে সমস্ত সীমান্ত এলাকা ছেড়ে দিয়ে সেনানিবাস এবং তৎকালীন জেলা শহরগুলোয় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। এই সময়ের মধ্যে মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ এলাকা মুক্ত করেছিল। নভেম্বর '৭১ এর প্রথম দিকে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় সম্মিলিত বাহিনী।
বাংলাদেশের সমগ্র যুদ্ধ এলাকাকে ৪ ভাগে বিভক্ত করে এই যৌথ কমান্ডের নেতৃত্বে সমস্ত সৈন্যবাহিনীকে সমন্বিত করে যুদ্ধ পরিকল্পনা গড়ে তোলা হয়। ৩রা ডিসেম্বর '৭১ পাকিস্তান অতর্কিতভাবে ভারত আক্রমণ করলে যুদ্ধের মোড় পরিবর্তিত হয়। ৬ই ডিসেম্বর '৭১ ভারত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে মুক্তিবাহিনীর মনোবল বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। এই পর্যায়ে সমন্বিত এক যুদ্ধ পরিকল্পনায় সম্মিলিত বাহিনী প্রচন্ড বেগে অগ্রসর হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করে।
১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বহু বুদ্ধিজীবিদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে। ১৬ই ডিসেম্বর '৭১ বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্য বিনা শর্তে সম্মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন পূর্বাঞ্চলের সম্মিলিত বাহিনী প্রধান লেঃ জেনারেল জগজিত সিং অরোরা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লেঃ জেঃ এ কে নিয়াজী।
এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন মুক্তিবাহিনীর উপ-সেনা প্রধান ও বিমান বাহিনী প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। এই অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন এস ফোর্স অধিনায়ক লেঃ কর্নেল কে এম সফিউল্লাহ, ২নং সেক্টরের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর এ টি এম হায়দার এবং টাঙ্গাইল মুক্তি বাহিনীর অধিনায়ক জনাব কাদের সিদ্দিকী। ১৬ ডিসেম্বর '৭১ বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। সেই থেকে প্রতি বছর এই দিনটি ''বিজয় দিবস'' হিসেবে পালিত হয়।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত