ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর খালপাড় এলাকায় পূর্ব শত্রুতার জেরে ছয়টি বসতবাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত আটটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এসময় দুর্বৃত্তরা নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করা সহ তিনটি গরু নিয়ে যায়। আগুনে অন্তত ছয়টি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিরামপুর খালপাড়ের নোয়াব মিয়া, হক মিয়া, ফজল হক, শহিদুল হক ও সোহেল মিয়ার বসতবাড়িতে একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালায়। তারা ধারালো অস্ত্র নিয়ে বাড়িঘরে ভাঙচুর চালায়, পরে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। স্থানীয়রা আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও বেশ কয়েকটি ঘর সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়।
শহিদুল হকের স্ত্রী পারভিন আক্তার বলেন, “ছয়-সাত মাস আগে জোয়ার টাকা নিয়ে গ্রামের কিছু লোকের সঙ্গে আমাদের ঝগড়া হয়েছিল। তখন গ্রামবাসীর মধ্যস্থতায় বিষয়টি মীমাংসা হয়। কিন্তু শুক্রবার বিকালে আমার শাশুড়ি মারা গেলে জানাজার নামাজে অংশ নিতে বাড়ির সব পুরুষ বাইরে চলে গেলে ইকবাল মিয়া, চাচ্চু মিয়া, জাকির শরিফ, আনিস মেম্বারসহ প্রায় ২০ জন আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা লাঠিসোটা ও দা-ছুরি নিয়ে বাড়িতে ভাঙচুর করে, ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। নগদ টাকা, গহনা, কাপড়চোপড় সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। এসময় তিনটি গরুও তারা ধরে নিয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। যেকোনো সময় তারা আবারও এসে আমাদের উপর হামলা করে মেরে ফেলতে পারে। পুলিশকে খবর দিয়েছি, কিন্তু এখনো কোন ধরনের নিরাপত্তা পাইনি।”
সোহেল মিয়ার স্ত্রী রুনা বেগম বলেন, “আমার স্বামী জানাজায় ছিলেন। সেই সুযোগে হামলাকারীরা এসে ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। আমার চোখের সামনে সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। সন্তানদের নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে আছি।”
ঘটনার পর থেকেই পুরো বিরামপুর খালপাড় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। স্থানীয়রা জানান, ঘটনাস্থলে গেলে দেখা যায়, ছয়টি বাড়ির বসতঘর সব পুড়ে গেছে। ছাইয়ের নিচে পড়ে আছে পোড়া আসবাব, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, এমনকি গবাদিপশুর খোয়াড়ও ধ্বংস হয়ে গেছে।
গ্রামবাসী আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, “আগে থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে ঝামেলা চলছিল। কিন্তু আগুন দেওয়ার ঘটনা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। পুরো এলাকা এখন আতঙ্কে আছে। শিশুরাও রাতে ঘুমাতে পারছে না।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বলেন, “ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিকভাবে আগুনের কারণ পূর্ব শত্রুতা বলেই জানা গেছে। লিখিত অভিযোগ পেলে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ওসি আরও জানান, “এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে পুনরায় কোনো সংঘর্ষ বা প্রতিশোধমূলক ঘটনা না ঘটে।”
ছাদেকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ বলেন, “আগে যারা ঝগড়া করেছিল, তারাই আবার বিদেশ থেকে লোক এনে নতুন করে সংঘাত উসকে দিচ্ছে। গ্রামে এখন দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।”
তিনি বলেন, “এলাকায় এখন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।”
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ঘরের ধ্বংসস্তূপের পাশে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নারী ও শিশুরা। তাদের চোখে-মুখে আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব। আগুনে পুড়ে যাওয়া পোড়া কাঠ ও ছাইয়ের স্তূপের ভেতর থেকে কেউ কেউ এখনো নিজেদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “গ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এভাবে বারবার শত্রুতা থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের মানুষ বাঁচবে না।”
এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল হক মিয়া বলেন, “এ ঘটনার আগে ছোটখাটো ঝগড়া হয়েছিল, কিন্তু এভাবে আগুন লাগিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত ভয়ংকর বিষয়। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দিক।”
বিরামপুর খালপাড় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে ছোটখাটো বিরোধ চলে আসছে। বিভিন্ন সময় জমিজমা, অর্থ লেনদেন ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এবার ‘জোয়ার টাকা’ নিয়ে শুরু হওয়া দ্বন্দ্বই বড় আকার ধারণ করেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
গ্রামবাসীর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশফেরত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই বিরোধকে আবার উসকে দিয়েছে। এর ফলে গ্রামে বিভক্তি বেড়েছে, এবং প্রতিশোধ পরায়ণতা থেকে হামলার ঘটনাটি ঘটেছে।
বর্তমানে বিরামপুর খালপাড় এলাকায় ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো গৃহহীন হয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তারা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, অভিযুক্তরা দ্রুত গ্রেপ্তার না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। গ্রামের সাধারণ মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তার প্রত্যাশায় এখন প্রশাসনের পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত