আমিনুল ইসলাম আহাদঃ শীতের শুরু মানেই দেশের গ্রামীণ জনপদে আখ থেকে গুড় তৈরির উৎসব। এ মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার দুলালপুর পূর্বপাড়া ও বিষ্ণুপুর গ্রামে চলছে ঐতিহ্যবাহী গুড় উৎপাদনের ব্যস্ততা। ভোরের কুয়াশা কাটার আগেই চুল্লির পাশে হাজির হন কৃষকরা। সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে আখ কাটা, চিপা, রস সংগ্রহ ও জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির একটানা কাজ।
গ্রামের পুরনো রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই নাকে ভেসে আসে জ্বাল দেওয়া আখের মিষ্টি সুবাস। বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় বড় বড় খোলা চুল্লি। তার ওপর বিশাল লোহার পাতিলে টগবগ করে ফুটতে থাকে আখের রস। শ্রমিকরা পালাক্রমে সেই রস নেড়ে ঘন করেন। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর তৈরি হয় খাঁটি গুড়, লালি ও চিনির মতো দানা।
দুলালপুর পূর্বপাড়ার কৃষক আবদুল মালেক বলেন, “শীতের সময়টাই আমাদের সোনার সময়। বছরের আয়ের বড় অংশ আসে এই গুড় বিক্রি থেকে। এ বছর আখের ফলন ভালো হওয়ায় গুড়ের মানও দারুণ হয়েছে।” তাঁর ভাষায়, প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে কাজ।
স্থানীয়দের দাবি, বিজয়নগরের মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও আখের স্বাভাবিক মিষ্টতার কারণেই এখানকার গুড় মানসম্মত ও সুস্বাদু হয়। বহু বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই পেশায় আগের দিনের গরু-চালিত চরণযন্ত্রের জায়গা নিয়েছে আধুনিক মেশিন। তবে গুড় তৈরির মূল পদ্ধতি রয়ে গেছে একই—পুরোপুরি প্রাকৃতিক, খাঁটি ও ঘন।
প্রতিদিনই দুলালপুর ও বিষ্ণুপুরে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের পাশাপাশি নাসিরনগর, আশুগঞ্জ, সরাইল, নবীনগর, মাধবপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে অনেকে আসছেন সরাসরি গুড় ও আখের রস কিনতে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে আসা ক্রেতা সায়েমা আক্তার বলেন, “এখানকার গুড়ের স্বাদ আলাদা। ভেজাল নেই, পুরোপুরি খাঁটি। তাই প্রতিবছর এখান থেকেই কিনে নিয়ে যাই।”
অনেকে গরম চুল্লির পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি গরম আখের রস পান করেন। শীতের সকালের আলাদা আনন্দ যেন এই টাটকা রসে। শিশু-কিশোররাও এই মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে সারা বছর। আখ কাটার ক্ষেত থেকে চুল্লি পর্যন্ত সব জায়গায় দেখা যায় তাদের কৌতূহলী উপস্থিতি।
যদিও মৌসুমটি কৃষকদের কাছে আনন্দের, রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জও। জ্বালানি কাঠের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরি এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় লাভের পরিমাণ কমেছে বলেও জানান অনেকে।
বিষ্ণুপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, “গুড় বানানো অনেক কষ্টের কাজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুল্লির আগুন সামলাতে হয়। জ্বালানির খরচও বেশ। তারপরও খাঁটি গুড় মানুষের কাছে পৌঁছে দিই।”
গুড় উৎপাদনকারী মোহাম্মদ আলী জানান, তাঁর পূর্বপুরুষরাও এই পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রামে ১৫ থেকে ২০ জন কৃষক গুড় উৎপাদনে যুক্ত। একশ পরিবারেরও বেশি মানুষ এই পেশার ওপর নির্ভরশীল।
আমি প্রতিদিন ৮০–১০০ কেজি গুড় ও লালি তৈরি করি। লালির প্রতিকেজি ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়। চাহিদা এত বেশি যে পাইকারি বিক্রি করার সুযোগই হয় না।”
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিনই বাইরে থেকে শত শত মানুষ গুড় বানানোর প্রক্রিয়া দেখতে আসেন। অনেকেই শুধু আখের গরম রস খেতেও যান।
এলাকার প্রবীণরা জানান, আগে ইক্ষু উৎপাদন কম ছিল। পরে উদ্যোগী কৃষকদের প্রচেষ্টায় এই এলাকায় আখ চাষের বিস্তার ঘটে। বর্তমানে উৎপাদিত গুড় পুরোপুরি স্থানীয় চাহিদায় ব্যবহৃত হলেও বাইরে রপ্তানির কোনো ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়দের মতে, বিজয়নগরে আখ ও গুড়কে কেন্দ্র করে কৃষি-ভিত্তিক মৌসুমী পর্যটন গড়ে তোলা গেলে অঞ্চলটি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পাবে। গুড় তৈরির প্রক্রিয়া দেখা, ক্ষেত ঘুরে দেখা, আখের রস পান—সব মিলিয়ে তৈরি হতে পারে নতুন এক পর্যটন অর্থনীতি।
কৃষকদের দাবি, সরকারীভাবে প্রযুক্তিগত সহায়তা, কম সুদের ঋণ ও সংরক্ষণ সুবিধা দিলে গুড় শিল্প আরও বড় পরিসরে গড়ে উঠবে, যুক্ত হবে নতুন কর্মসংস্থান।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত