মজিবুর রহমান,নেত্রকোনা : নেত্রকোনা জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে ছয়টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এসব অফিসে অন্য উপজেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে নিয়মিত জমি নিবন্ধন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন জমির ক্রেতা-বিক্রেতা ও দলিল লেখকরা। একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব আদায়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শুধু সাব-রেজিস্ট্রার নয়, জেলার ১০টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস তদারকির দায়িত্বে থাকা জেলা রেজিস্ট্রারের পদও দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। এ কারণে সুনামগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রারকে নেত্রকোনায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সপ্তাহে বুধবার ও বৃহস্পতিবার নেত্রকোনায় অফিস করেন। ফলে জেলার নিবন্ধন ব্যবস্থাপনায় জনবল সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া, পূর্বধলা ও কলমাকান্দা উপজেলায় বর্তমানে নিয়মিত সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে কেন্দুয়া, মদন, খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা ও দুর্গাপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য।
শূন্য পদগুলোতে কর্মরত অন্য কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা সপ্তাহে মাত্র এক থেকে দুই দিন সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে নির্ধারিত দিনে কর্মকর্তা অফিসে উপস্থিত না থাকলে দলিল নিবন্ধন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মকর্তার অনুপস্থিতির কারণে এক মাসেরও বেশি সময় দলিল সম্পাদন না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি কেন্দুয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় সাব-রেজিস্ট্রার না আসায় জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা দলিল নিবন্ধন করতে পারেননি। জরুরি প্রয়োজনে জমি কেনাবেচা করতে আসা অনেক মানুষকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে।
স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের অভিযোগ, সপ্তাহে এক-দুই দিন কর্মকর্তা আসবেন বলে তারিখ দেওয়া হলেও তিনি বাস্তবে অফিসে না আসা পর্যন্ত দলিল নিবন্ধন হবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। আবার দলিলের কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটি থাকলে সংশোধনের জন্য আরও এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। যেদিন কর্মকর্তা অফিসে আসেন, সেদিন একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক দলিল নিবন্ধনের চাপ তৈরি হয়। এতে আগে-পরে দলিল সম্পাদন নিয়ে হুড়োহুড়ি, অসন্তোষ ও বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে।
এদিকে যেসব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়মিত কর্মকর্তা রয়েছেন, সেখানেও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কারণ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য এসব কর্মকর্তাকে অন্য উপজেলায় যেতে হচ্ছে। ফলে তাদের নিজ কর্মস্থলেও কার্যত জনবল সংকট তৈরি হচ্ছে। এতে পুরো জেলার নিবন্ধন কার্যক্রমে এক ধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোকে কেন্দ্র করে নেত্রকোনা জেলার কয়েক শতাধিক দলিল লেখক এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। নিয়মিত দলিল নিবন্ধন না হওয়ায় তারাও আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলিল লেখক সবুজ খন্দকার বলেন, নিয়মিত জমি নিবন্ধন না হওয়ায় দলিল লেখকদের আয় কমে গেছে। তাদের অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জমি ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন কর, ফি ও অন্যান্য খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রারের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় দলিল নিবন্ধন কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব আদায়ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে দীর্ঘসূত্রতা, সময়ক্ষেপণ ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন না হওয়ায় অনেককে বারবার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আসতে হচ্ছে। এতে তাদের সময় ও অর্থ দুটিই অপচয় হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, জমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা স্বাভাবিক রাখতে শূন্য পদগুলোতে দ্রুত স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার পদায়ন করা হোক। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বনির্ভর ব্যবস্থা বন্ধ করে প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
নেত্রকোনার ভারপ্রাপ্ত জেলা রেজিস্ট্রার মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, জেলায় বর্তমানে চারজন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। তাদের দিয়ে ১০টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পর্যায়ক্রমে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শূন্য পদে দ্রুত কর্মকর্তা পদায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, পদ শূন্য থাকলে অফিসের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়াটা স্বাভাবিক। বর্তমানে তিনজন কর্মকর্তা প্রশিক্ষণে রয়েছেন। তারা প্রশিক্ষণ শেষে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে এলে জনদুর্ভোগ কমার পাশাপাশি জেলার নিবন্ধন কার্যক্রমও স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত