জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে গাছের ডালে শালিকের বাসা—দৃশ্যটি পরিচিত। তবে সেই বাসার উপকরণে যদি খড়-কুটোর পাশাপাশি পলিথিন, প্লাস্টিক, সুতা কিংবা প্যাকেটের অংশ জায়গা করে নেয়, তখন সেটি আর নিছক প্রকৃতির দৃশ্য থাকে না; বরং হয়ে ওঠে পরিবেশের ওপর মানুষের চাপের এক নীরব বার্তা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের বসতি, সড়ক, আবাসিক ভবন ও বর্জ্য ফেলার স্থানগুলোর কাছাকাছি থাকা শালিকের বাসায় মানবসৃষ্ট বর্জ্যের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। আর বাসা তৈরিতে এ ধরনের উপকরণের পরিমাণ যত বাড়ছে, ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার সাফল্য তত কমছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশিস কুমার দত্ত ও তাঁর শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহমুদ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণাটির শিরোনাম ছিল—Nesting in a Human-Dominated Environment: Quantifying Anthropogenic Materials in the Nests of Common Myna (Acridotheres tristis)।
৯৬ জোড়া কৃত্রিম বাসায় নজর:
গবেষণার অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসে ৯৬ জোড়া কৃত্রিম বাসার বাক্স স্থাপন করা হয়।
এসব বাক্সে দুটি ভিন্ন আকারের প্রবেশপথ রাখা হয়েছিল। পরে শালিকের ব্যবহৃত বাসা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা সেখানে মানুষের তৈরি আট ধরনের উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করেন।
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং ও মোড়কজাত সামগ্রী। এসব উপাদান পাওয়া গেছে ৭১ শতাংশ বাসায়। এরপর রয়েছে পলিথিন—৬১ শতাংশ বাসায়। এছাড়া সুতা বা দড়ি ২৭ শতাংশ, ধাতব উপাদান ২১ শতাংশ, কাগজ বা কার্ডবোর্ড ১০ শতাংশ, নন-ওভেন কাপড় ৬ শতাংশ, কাপড় ৪ শতাংশ এবং খড় বা প্লাস্টিকের টুকরো ২ শতাংশ বাসায় পাওয়া গেছে।
গবেষণায় ব্যবহৃত মানবসৃষ্ট উপকরণের মধ্যে সাদা বা বর্ণহীন উপাদানের আধিক্যও দেখা গেছে। মোট কৃত্রিম উপাদানের ৮১ দশমিক ৭২ শতাংশ ছিল সাদা বা প্রায় বর্ণহীন। এতে নির্দিষ্ট কিছু রঙের উপকরণের প্রতি শালিকের আকর্ষণ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
ডিমের সংখ্যা নয়, কমছে বাচ্চা ফোটার সাফল্য:
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি উঠে এসেছে প্রজননের ক্ষেত্রে।
৪০টি বাসার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, বাসায় মানবসৃষ্ট উপাদানের উপস্থিতি সরাসরি ডিমের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়নি। কিন্তু যেসব বাসায় প্লাস্টিক ও অন্যান্য কৃত্রিম বর্জ্যের অনুপাত বেশি ছিল, সেসব বাসায় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।
গবেষক আশিস কুমার দত্ত বলেন, মানুষের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে শালিক দীর্ঘদিন ধরে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ফলে তাদের বাসায় বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কতটা প্লাস্টিক তাদের জন্য অতিরিক্ত? গবেষণায় বাসার ভেতর প্লাস্টিক ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট বর্জ্যের উদ্বেগজনক উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
তাঁর মতে, শালিক বাসা বানাতে যে উপকরণ সংগ্রহ করছে, সেগুলো শুধু পাখিটির আচরণই তুলে ধরে না; একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্লাস্টিক দূষণের বাস্তব চিত্রও সামনে আনে।
মানুষের ফেলা বর্জ্যই ফিরছে পাখির বাসায়:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও গবেষণাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশমাইল এলাকায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রটি ২০২০ সাল থেকে কার্যত অচল।
অন্যদিকে বটতলা, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন লেক ও একাডেমিক ভবনের আশপাশে নিয়মিত বর্জ্য ফেলার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কেন্দ্রটি অচল থাকার পেছনে দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অর্থের ঘাটতিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ফলে ক্যাম্পাসের মাটিতে পড়ে থাকা প্লাস্টিক কেবল পরিবেশকেই দূষিত করছে না; সেটিই আবার শালিকের ঠোঁটে উঠে যাচ্ছে বাসা তৈরির উপকরণ হিসেবে।
অর্থাৎ, মানুষ যে বর্জ্য ফেলে যাচ্ছে, প্রকৃতি সেটিকেই অন্যভাবে ব্যবহার করছে—কিন্তু তার মূল্য দিতে হচ্ছে বন্যপ্রাণীকে।
শুধু অবকাঠামো নয়, বদলাতে হবে আচরণও:
বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মঈনউদ্দীন মনে করেন, প্লাস্টিক, কাপড় ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে মেশানো উচিত নয়।
কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অবকাঠামো প্রয়োজন হলেও শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; মানুষের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর কাছে একটি প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি ক্যাম্পাসকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে প্রতি সপ্তাহে প্লাস্টিক ও পলিথিন পরিষ্কারের জন্য দল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। দোকানসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শালিকের বাসা যেন সতর্কবার্তা:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই জীববৈচিত্র্যের জন্য দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিত। সেই ক্যাম্পাসের গাছপালায় শালিকের বাসায় যখন মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের উপস্থিতি বাড়ে, তখন সেটিকে শুধু একটি পাখির বাসা তৈরির কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গবেষণার ফলাফল বরং দেখাচ্ছে, মানুষের তৈরি বর্জ্য কীভাবে ধীরে ধীরে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ঢুকে পড়ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—পাখিরা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে যে উপকরণ ব্যবহার করছে, সেটিই তাদের প্রজনন সাফল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই জাবির শালিকের বাসায় প্লাস্টিকের উপস্থিতি শুধু পাখির আচরণ বদলে যাওয়ার গল্প নয়; এটি পুরো ক্যাম্পাসের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি নীরব সতর্কবার্তাও।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে হয়তো শালিকের বাসায় আবারও প্লাস্টিকের বদলে ফিরে আসবে প্রকৃতির নিজস্ব উপকরণ—খড়, কুটো, শুকনো পাতা আর ছোট ছোট ডাল।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত