মজিবুর রহমানঃ রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; এটি মূলত মতের আদান-প্রদান, যুক্তির লড়াই এবং জনস্বার্থে পথ খোঁজার একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ভিন্নমত থাকবে, বিতর্ক থাকবে, এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ। কিন্তু সেই মতবিনিময় যদি শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মানের সীমা অতিক্রম করে, তাহলে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে ঘাটতিটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো ভাষার সংযমের অভাব এবং সমালোচনায় সমমর্যাদার নীতির ক্রমাবনতি। মতভেদ যখন যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কটূক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক পরিবেশকে অশান্ত করে তোলে না, বরং সমাজে বিভাজনও গভীর করে।
রাজনীতির বিভিন্ন স্তর ছাত্র, যুব, স্বেচ্ছাসেবক, শ্রমিক, কৃষক থেকে শুরু করে মূলধারার নেতৃত্ব। সবখানেই এই অস্বাস্থ্যকর প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান। অনেক সময় দেখা যায়, সমালোচনার নামে এমন ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা শালীনতা ও রাজনৈতিক সৌজন্যের সীমা লঙ্ঘন করে।
বিশেষ করে নিম্নস্তরের কিছু নেতা উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে যে ভাষায় মন্তব্য করছেন, তা শুধু অসম্মানজনকই নয়, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। আবার অনেক ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ নেতারাও নিজেদের অবস্থান বিবেচনা না করে আবেগপ্রবণ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি মৌলিক ভিত্তি হলো সমমর্যাদার আলোচনার পরিবেশ। সমালোচনা অবশ্যই থাকবে, তবে তা হতে হবে যুক্তিনির্ভর, পরিমিত এবং প্রাসঙ্গিক স্তরে সীমাবদ্ধ। একজন ছাত্রনেতা ছাত্রপর্যায়ের বিষয়ে কথা বলবেন, যুবনেতা যুবপর্যায়ের প্রশ্নে মত দেবেন, আর জাতীয় পর্যায়ের নেতারা তাঁদের সমপর্যায়ের প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিতর্কে যুক্ত হবেন। এমন আলোচনায় ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনাও সৃষ্টি হবে না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাস্তবে আমরা প্রায়ই এর উল্টো চিত্র দেখি। সমালোচনার আড়ালে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি এবং অবমাননাকর ভাষার ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা সমাজের অন্যান্য স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি করে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্মসংযম, দায়িত্ববোধ এবং রাজনৈতিক শিক্ষার পুনর্গঠন। প্রতিটি স্তরের নেতাদের উপলব্ধি করতে হবে তাঁদের ভাষা ও আচরণই অনুসারীদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তাই সমালোচনা থাকুক, কিন্তু তা হোক তথ্যভিত্তিক, সংযত এবং সম্মানজনক।
তবে এই সংস্কৃতি গড়ে তোলার পথে বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অতিরিক্ত দলীয় মেরুকরণ, নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। সব মিলিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সংযত ও দায়িত্বশীল ভাষার চর্চা অনেক সময়ই আড়ালে পড়ে যায়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সুস্পষ্ট দলীয় আচরণবিধি প্রণয়ন, কার্যকর রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং স্তরভিত্তিক যোগাযোগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি নাগরিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে রাজনৈতিক আচরণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং সুস্থ চর্চা উৎসাহিত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং ভিন্নমতের অংশীদার হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। মতভেদ থাকবে, বিতর্কও চলবে, কিন্তু তা হবে শালীন, যুক্তিনির্ভর এবং দায়িত্বশীল। এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলেই একটি পরিণত, সহনশীল ও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
[মজিবুর রহমান
গণমাধ্যম কর্মী
Mozibur.Kendra2016@gmail.com]
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত