মো.সাহিদুল ইসলাম শাহীন:- যশোর জেলার শার্শা উপজেলার কায়বা ইউনিয়ন বিএনপি'র নেতা-কর্মীদের সাথে শার্শা বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব নূরুজ্জামান লিটন-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং দলীয় সাংগঠনিক বিষয়াদী নিয়ে এক ঘরোয়া বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল শুক্রবার(১০ এপ্রিল) বিকালে বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশন রোডস্থ বিএনপি'র দলীয় কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কায়বা ইউনিয়ন বিএনপি'র সভাপতি রবিউল হোসেনের নেতৃত্বে ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের শতাধিক নেতা-কর্মী এ আলোচনায় অংশ নেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ সমূহ ও দলের অভ্যন্তরীন বিভিন্ন বিষয়াদী নিয়ে অভিযোগ-অনুযোগ তুলে ধরেন কায়বা ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা।
পরাজয়ের গ্লানি বুকে নিয়ে সভায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন নুরুজ্জামান লিটন। সভায় উত্থাপিত পরাজয়ের কারণ, নেতা-কর্মীদের উত্থাপিত অভিযোগ-অনুযোগ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় লিটন বলেন-
বিগত ১৭ বছর যারা দলের সাথে বেইমানি করেছেন এবং দলের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছেন, তারা আর সামনে থাকতে পারবেন না। দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের এবার সামনে নিয়ে আসতে হবে। যারা দলের দুর্দিনে পাশে ছিলেন, তারাই এবার নেতৃত্ব দেবেন। বেইমানদের চিহ্নিত করে তাদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবে মাত্র সরকার গঠন করেছে। এখন সময় হয়েছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী শক্তিগুলো নানা ষড়যন্ত্র করে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। আমাদের নেতা তারেক রহমানের নামে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা কোনো ষড়যন্ত্রেই ভয় পাই না। আমরা ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের মতো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। এখন আমরা আরও শক্তিশালী। ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব বাধা মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব "ইনশাআল্লাহ"।
নির্বাচন এবং দলীয় কৌশল নিয়ে বেশ আবেগপ্রবণ এবং অনুশোচনামূলক বক্তব্যে একটি বিষয় তুলে ধরে বলেন, ১২ফেব্রুয়ারী/২০২৬ নির্বাচনে তার কাছে থাকা তথ্যানুযায়ী কয়েকটি ভোট কেন্দ্রের অনেকগুলো নির্বাচনী শিট বা নথিপত্র একই হাতের লেখায় লেখা ছিল। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হাতের লেখা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ছিল না।
তিনি এই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও জানিয়ে ছিলেন,কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। নিজের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের প্রতি অনুশোচনা নিয়ে তিনি স্বীকার করেন, দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের দূরে সরিয়ে রেখে অন্য কিছু মানুষকে সামনে এনেছিলেন, যা ছিল তার জন্য একটি বড় ভুল।
দলের তৃণমূল ও বিশ্বস্ত কর্মীরা তাকে এই বিষয়ে সতর্ক করলেও তিনি তা শোনেননি। তিনি মানুষকে অতিরিক্ত বিশ্বাস করেছিলেন এবং আপন ভেবেছিলেন, কিন্তু প্রতিদানে তিনি বেইমানির শিকার হয়েছেন। নির্বাচনের দিন আমার নিজের লোককে বলেছিলাম তোমরা পেছনে থাকো আর ওদের সামনে দাও, এটা আমার জন্য বড় কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ সময় নেতা-কর্মীরা উচ্চস্বরে তার সাথে একমত পোষণ করেন।
তিনি নাভারণ ও শার্শার দুটি ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট নিয়োগে বাধার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তাঁর দলের কোনো পোলিং এজেন্টকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রিজাইডিং অফিসারও এজেন্টদের ব্যাপারে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলের একনিষ্ঠ কর্মীদের পরিবর্তে এমন কিছু ব্যক্তিদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল যারা অন্য পক্ষ বা প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তিনি এই ঘটনাকে দলের সঙ্গে চরম ‘বেঈমানি’ হিসেবে অভিহিত করেন।একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ১৪০০ ব্যালটের মধ্যে ১০০টি গায়েব হয়ে গিয়েছিল।
পরবর্তীতে চাপের মুখে সেগুলো উদ্ধার করা হয়। তিনি দাবি করেন, উদ্ধারকৃত ১০০টি ব্যালট অন্য প্রতীকের বাক্সে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং দলীয় কিছু ব্যক্তির রহস্যজনক ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
নির্বাচনের আগে অনেক নেতা ও তাদের কর্মীরা অন্য পক্ষের (দাড়িপাল্লা) হয়ে কাজ করেছেন এবং সাধারণ কর্মীদের হুমকি দিয়েছেন। তিনি সেইসব নেতাদের সমালোচনা করেন যারা দলের পদে থেকে অন্য প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন অথচ এখন আবার দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি এটিকে লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করেন। নির্বাচনের সময় তাকে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়েছে এবং তার নিজ এলাকায় ঠিকমতো প্রচারণা চালাতে দেওয়া হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এত কম সময়ে কেউ নির্বাচন করেছে কি না, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি যে আগ্রহ ছিল, তাতে তাঁর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস ছিল।
তাঁদের দলের কিছু নেতা জামায়াতের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন এবং সেই অর্থ রাতে দলের কিছু 'দুর্বল' কর্মীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন যেন তাঁরা নির্বাচনের দিন সক্রিয় না থাকে। দলের নেতাদের এই ধরনের 'বেঈমানি' না থাকলে নির্বাচনী ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। তিনি স্পষ্ট জানান যে, আওয়ামী লীগের ভোট যদি ঠিকঠাকভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হতো, তবে তিনি আজ সংসদে কথা বলতে পারতেন।
বক্তব্যের শেষে তিনি উপস্থিত নেতা-কর্মীদের ব্যাপক করতালির মধ্যে বলেন, "আমি আমার কাছে পাশ করেছি।" তিনি মনে করেন ৯৩-৯৪ হাজার ভোট পাওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয় এবং এটি সাধারণ কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমেরই ফসল।
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে অনেক বড় বড় কথা বলছে, কিন্তু তাদের রাজনীতির সুযোগ করে দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া তাদের আগলে রেখেছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তারা আজ তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করে।
তিনি দলীয় কর্মীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেন, তারা বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন, তাই সকলকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তবে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। এ সময় তিনি শার্শা দিঘী ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা স্মরণ করে বলেন, তিনি দলের দুঃসময়ে কখনও আওয়ামী লীগের কাছে মাথা নত করেননি। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের নেতা-কর্মীরা মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন, রিকশা চালিয়েছেন, এমনকি পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন, তবুও দল ত্যাগ করেননি।
দলের ঐক্য রক্ষায় আমাদের সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। আমি আপনাদের নেতা হিসেবে সবসময় আপনাদের পাশে আছি। আপনাদের যেকোনো সুখ-দুঃখে বা কেউ যদি কোনোভাবে অসম্মানিত বোধ করেন, তবে নির্দ্বিধায় আমাকে জানাবেন। আমি অবশ্যই বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।"
তিনি আরও যোগ করেন যে, দলের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত যদি কারো মনে সামান্য কষ্টের কারণ হয়, তবে সেটি ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে দলের স্বার্থে মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সংহতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পুরো বক্তব্যে তিনি তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং সুবিধাবাদী নেতাদের থেকে সাবধান হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি কিছু নেতার দ্বিমুখী আচরণের সমালোচনা করেন। যারা মাইকে বড় বড় কথা বলেন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকেন, কিন্তু প্রয়োজনের সময় তাদের আসল রূপ বেরিয়ে আসে—নেতা-কর্মীদের এমন নেতাদের থেকে সতর্ক থাকার ইঙ্গিত দেন শার্শা বিএনপি'র এই নেতা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561
© সময়ের আবর্তন ২০২০ - ২০২৫ সর্বসত্ব সংরক্ষিত