
মজিবুর রহমান, নেত্রকোনাঃ ২০২৪ সালের উত্তাল জুলাই। দেশজুড়ে তখন ছাত্র আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলায় প্রতিটি জনপদে তরুণেরা উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা বলছে। সেই সময়ে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা ছিল একপ্রকার নীরব। কিন্তু নীরবতা ভাঙে ১৬ জুলাই ২০২৪ দুপুরে। কেন্দুয়া সরকারি কলেজ থেকে কয়েক ডজন ছাত্র একসঙ্গে বেরিয়ে আসে প্রতিবাদী স্লোগানে। নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা দিলশাদ নাসিম প্লাবন।
এক বছর পেরিয়ে আবার এসেছে ১৬ জুলাই। সেই সময়কার সাহসী নেতৃত্ব, প্রতিবাদের ভাষা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বললেন সেদিনকার আলোচিত এই তরুণ নেতা।
প্রতিবেদক: আপনার পুরো নাম, বয়স ও বর্তমানে কোথায় পড়াশোনা করছেন?
প্লাবন: আমার পুরো নাম মো. দিলশাদ নাসিম প্লাবন। বয়স ২১ বছর। আমি বর্তমানে কেন্দুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি।
প্রতিবেদক: ছাত্ররাজনীতিতে আপনার যুক্ত হওয়ার গল্পটা জানতে চাই।
প্লাবন: ছোটবেলা থেকেই আমাদের পরিবারে বিএনপির রাজনীতির আবহ। আমার বড় মামা শ্রমিকদলের নেতা, মেজো মামা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। আর আমার ছোট মামা শফিকুল ইসলাম শফিক। যিনি একসময় কেন্দুয়া কলেজ ও উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন, পরে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বে আছেন।
এমন এক পরিবারের ছায়াতেই বড় হয়েছি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর দেখলাম কত অন্যায় চুপ করে মেনে নিতে হয় শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কেউ কথা বলে না। সেখান থেকেই আমার রাজনীতির প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়। আমি মাঠে নেমেছি ছাত্রদলের প্ল্যাটফর্মে, কলেজে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ করেছি।
প্রতিবেদক: ১৬ জুলাই ২০২৪-এর সেই মিছিলের কথা বলুন। কীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
প্লাবন: সেদিন দেশজুড়ে চলছিল ছাত্র আন্দোলন। বিশেষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলন। আমি অনুভব করলাম, কেন্দুয়ার মতো প্রান্তিক এলাকার ছাত্ররাও ক্ষতিগ্রস্ত, অথচ কেউ কিছু বলছে না। তাই ঠিক করলাম, নীরব থাকবো না, কিছু একটা করবো।
আমি ৪০-৫০ জন ছাত্রকে সংগঠিত করলাম। ১৬ জুলাই বেলা ২টার দিকে কলেজ চত্বর থেকে মিছিল নিয়ে বেরোলাম। সেদিনের স্লোগান ছিল “কোটা নয়, মেধা চাই!”
“আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না!” “ডাইরেক্ট একশন, ডাইরেক্ট একশন!” সেই স্লোগান আজও আমার কানে বাজে।
প্রতিবেদক: মিছিলের সময় কী ধরনের বাধার মুখে পড়েছিলেন?
প্লাবন: বাজারের দিকে মিছিল এগোতেই স্থানীয় এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতার অনুসারীরা মিছিল থামিয়ে দেয়। প্রথমে ধাক্কাধাক্কি, পরে সরাসরি হুমকি “মিছিল করতে আসছিস কার কথায়?”
আমরা ভয় পাইনি। বরং প্রতিরোধের চেষ্টা করেছি। সেদিন আমাকে, সহপাঠী সিয়ামসহ আরও কয়েকজনকে তারা মারধরও করেছিল। সেই দৃশ্যের ভিডিও পরে ফেসবুকে ভাইরাল হয়, যা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেদক: এরপর কি কোনো চাপ বা হুমকি পেয়েছিলেন?
প্লাবন: অবশ্যই। এরপর থেকে রাতে বাসায় স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারতাম না। পুলিশি হয়রানি শুরু হয়। অচেনা নম্বর থেকে হুমকির ফোন আসতে থাকে। কিন্তু আমি চুপ থাকিনি। সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত লিখেছি, কথা বলেছি।
প্রতিবেদক: কীভাবে সেই পরিস্থিতি সামলালেন?
প্লাবন: আমার পরিবার, বিশেষ করে ছোট মামা আমার পাশে ছিলেন। দলের সিনিয়র নেতারাও সাহস জুগিয়েছেন। আমি শুধু জানতাম, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছি, ভয় পেলে চলবে না।
প্রতিবেদক: এক বছর পর ফিরে তাকিয়ে কী মনে হয়?
প্লাবন: হয়তো অনেকে ভুলে গেছে। কিন্তু যারা সেদিন আমার সঙ্গে মিছিলে ছিল, তারা এখনো গর্ব করে। আমাদের সেই ছোট্ট মিছিল হয়তো সংখ্যায় ছোট ছিল, কিন্তু তার প্রভাব ও প্রতীকী শক্তি ছিল বিশাল।
প্রতিবেদক: প্রান্তিক ছাত্রদের জন্য আপনার ভাবনা কী?
প্লাবন: নেতৃত্ব দিতে হলে একটা শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম ও সাপোর্ট দরকার। এমন পরিবেশ তৈরি করতে চাই যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরাও ঢাকা বা রাজশাহীর শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ পাবে।
কোচিং ছাড়া ভর্তি প্রস্তুতি, অনলাইন সুবিধার উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়া, সব নিয়েই ভাবছি।
প্রতিবেদক: বর্তমান ছাত্র রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
প্লাবন: রাজনীতি এখন পেশীশক্তি আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আদর্শ হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আমার মতো অনেকেই রাজনীতি করতে চায় শুধু ন্যায়ের জন্য, কিন্তু তারা জায়গা পাচ্ছে না। এই প্রবণতা বদলাতে হবে।
প্রতিবেদক: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
প্লাবন: ছাত্র রাজনীতির প্ল্যাটফর্মে থেকে দেশের জন্য কাজ করে যেতে চাই। উচ্চশিক্ষা শেষে দেশের জন্য কাজ করাই আমার লক্ষ্য।
প্রতিবেদক: রাজনীতি প্রসঙ্গে আপনার প্রিয় কোনো উক্তি বলবেন?
প্লাবন: “ভয়ের সঙ্গে লড়াই করে কথা বলা, সেটাই রাজনীতি।”
কেন্দুয়ার তরুণ প্লাবনের এই কথাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রান্তিক জনপদেও জন্ম নেয় সাহসী কণ্ঠস্বর, যারা অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াতে শেখেনি। তারাই ভবিষ্যতের আলোর দিশারি।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
পাইকগাছায় গাঁজাসহ দুই যুবক আটক
পাইকগাছায় গাঁজাসহ দুই যুবক আটক
বাকেরগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জব্দকৃত কারেন্ট জাল পুড়িয়ে...
বাকেরগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জব্দকৃত কারেন্ট...
সাপাহারে শিরন্টি ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শাহজাহান আলীর গণসংযোগ
সাপাহারে শিরন্টি ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শাহজাহান...
শেরপুর ডপস সদস্যদের মূল্যায়ন পরীক্ষা ও শিক্ষা উপকরণ...
শেরপুর ডপস সদস্যদের মূল্যায়ন পরীক্ষা ও...
শেরপুর পূজা উদযাপন ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এমপি রাশেদের...
শেরপুর পূজা উদযাপন ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে...
জনপ্রিয়তার শীর্ষে ইমদাদুল হক ইমদাদ: বেনাপোলে বইছে পরিবর্তনের...
জনপ্রিয়তার শীর্ষে ইমদাদুল হক ইমদাদ: বেনাপোলে...