• অপরাধ ময়মনসিংহ
  • ত্রিশাল প্রকৌশল দপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ: ভুয়া নারী শ্রমিক ও নিয়োগ বাণিজ্যে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ

ত্রিশাল প্রকৌশল দপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ: ভুয়া নারী শ্রমিক ও নিয়োগ বাণিজ্যে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ

প্রকাশিত: ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ , ১১ এপ্রিল ২০২৬, শনিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 2 months আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরে বিধি ভেঙে নিয়োগ-বাণিজ্য এবং ভুয়া নারী শ্রমিক দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের নথি অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর আওতায় পরিচালিত গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে উপজেলার বিভিন্ন সড়কে মোট ৬৭ জন নারী শ্রমিক ও ৬ জন সুপারভাইজার কাজ করার কথা রয়েছে। এ খাতে প্রতি মাসে সরকারের প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে বাস্তবে সেই ব্যয়ের প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার অনেক সড়কের পাশ ঝোপঝাড়ে আচ্ছাদিত এবং বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। অথচ এসব কাজ নিয়মিতভাবে এই প্রকল্পের মাধ্যমেই সম্পন্ন হওয়ার কথা। মাঠপর্যায়ে শ্রমিকদের উপস্থিতিও খুব কম লক্ষ্য করা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা অনিয়ম আড়াল করতে তথ্য দিতে গড়িমসি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে কাগজে শ্রমিক দেখানো হচ্ছে এবং ভুয়া স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিল উত্তোলন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এলসিএস (LCS) সুপারভাইজার নিয়োগে সরকারি নীতিমালা মানা হয়নি। যেখানে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার কথা, সেখানে একই ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন ধরে বহাল রাখা হয়েছে। এতে নতুন প্রার্থীরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ছয়জন সুপারভাইজারের অধীনে তালিকাভুক্ত ৬৭ জন নারী কর্মীর বিপরীতে বাস্তবে নিয়মিত কাজের উপস্থিতি মিলছে না।

স্থানীয়দের ভাষ্য, “মাঝে মাঝে দু-একজন শ্রমিক দেখা গেলেও নিয়মিত কোনো কাজ হয় না। অথচ কাগজে দেখানো হচ্ছে বড় সংখ্যক শ্রমিক।”

উপজেলার নওপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবু সাঈদ বলেন, “আমি নিয়মিত ত্রিশালের বিভিন্ন সড়কে যাতায়াত করি। তবে কখনো কাউকে দেখিনি রাস্তার পাশের ভাঙন মেরামত ও ঝোপঝাড় পরিস্কার করতে। অথচ শুনি অনেক মহিলা সড়কে কাজ করার জন্য নিয়োজিত আছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকৌশল দপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, সুপারভাইজার ও নারী কর্মী নিয়োগে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যক্তিদের দিয়ে কাজ দেখানো হচ্ছে। এমনকি কাজ না করেই ভুয়া নাম ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, তালিকাভুক্ত নারী কর্মীদের মধ্যে একজনকে মাঠের কাজে না লাগিয়ে দপ্তরের ভেতরে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার মেয়েকে উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেনের ব্যক্তিগত বাসায় গৃহকর্মীর কাজে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। তবে উপজেলা প্রকৌশলী এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি অর্গানাইজার মোঃ ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে ৬৭ জন নারী কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। মাঠে গেলে তাদের দেখা যাবে।” তবে কর্মীরা কোন স্পটে কোথায় কাজ করছে এবং তাদের নাম-পরিচয় জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, “সব কার্যক্রম সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই পরিচালিত হচ্ছে। আমার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আমার জানামতে অফিসে কাজ করা মহিলা ও তার মেয়ে তালিকাভুক্ত নয়।

কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” নারী কর্মীদের তালিকা প্রকাশ প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রয়োজন হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা সংগ্রহ করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সালমান রহমান রাসেল বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয় উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি ও অডিটের ঘাটতির কারণেই এমন অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর