স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী

প্রকাশিত: ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ , ২২ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 19 hours আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

মজিবুর রহমান: দারিদ্র্যকে জয় করে লোকসাহিত্যের সাধক, আর দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদায় উজ্জ্বল এক অনন্য ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী। বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অসামান্য অবদানের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের দেওয়া খেতাব প্রত্যাখ্যান করে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি। সাহিত্যসাধনা, নৈতিক দৃঢ়তা ও দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন এই কৃতী মানুষ।

১৯০১ সালের ২২ অক্টোবর নেত্রকোনা জেলার তৎকালীন কেন্দুয়া থানা, বর্তমানে নেত্রকোনা সদর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের কাসিমপুর গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। পিতৃবিয়োগের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনেও বাধা আসে। তবু অধ্যবসায় ও মেধার জোরে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সাহসী অবস্থান। ১৯৭০ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘তঘমা-ই-খেদমত’ খেতাবে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের প্রতিবাদে তিনি সেই খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন বলে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।

ব্যক্তিগত সম্মাননা ও স্বীকৃতির চেয়ে দেশের স্বাধীনতা, মানুষের মর্যাদা এবং ন্যায়বোধকে প্রাধান্য দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত তাঁর দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার পরিচয় বহন করে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি লোকসাহিত্য সংগ্রহে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৮ সাল থেকে তিনি বিশেষভাবে লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত গান, কাহিনি, প্রবাদ-প্রবচনসহ নানা লোকজ উপাদান সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লোকসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৮ সালে তাঁকে ‘লোকসাহিত্য বিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

শিক্ষকতা, সাহিত্যসাধনা ও লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী নিজের কর্মজীবনকে অর্থবহ করে তুলেছিলেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা মানুষের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু দৃঢ় মনোবল ও আদর্শনিষ্ঠা থাকলে সেই বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। আর দেশপ্রেমের প্রকৃত পরিচয় মেলে সংকটের মুহূর্তে নিজের অবস্থান ও নীতির প্রতি অবিচল থাকার মধ্য দিয়ে।

১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জন্মদিনে এই কৃতী মানুষকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যকর্ম, দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। তাঁর রচনা সংরক্ষণ, গবেষণা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা আয়োজনের মাধ্যমে এই লোকসাহিত্য সাধকের স্মৃতি ও অবদান আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

সেই লক্ষ্যে প্রয়াত সাধক সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী ১২৫ জন্মবার্ষিকীতে কেন্দুয়া লোকজ সাহিত্য আসর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকালে তাঁর জীবনকর্ম নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

কেন্দুয়া প্রেসক্লাব অডিটোরিয়ামে এই কৃত্তিমান পুরুষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকেরা সাহিত্য প্রেমি, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি কামনা করেছেন।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর