বাবার লাশ নিতে সন্তানের অস্বীকৃতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগ খোকন মিয়া দাফন

প্রকাশিত: ১২:২৮ অপরাহ্ণ , ৫ মে ২০২৬, মঙ্গলবার , পোষ্ট করা হয়েছে 1 month আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

আমিনুল ইসলাম আহাদঃ চার দিন ধরে হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকা বাবার মরদেহ নিতে কথা দিয়েও শেষ পর্যন্ত আসেননি ছোট ছেলে রানা। অবশেষে পরিবারের সম্মতি না থাকায় খোকন মিয়া (প্রায় ৫০) কে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (৪ মে) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর কর্তৃপক্ষ রানার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আর অপেক্ষা না করে যেন তার বাবার মরদেহ দাফন করে দেওয়া হয়। এর আগে রোববার (৩ মে) তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করানো হয়েছিল অন্তত শেষবারের মতো এসে বাবার মরদেহ গ্রহণ করে নিজ এলাকায় দাফনের ব্যবস্থা করতে।

এমনকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের পক্ষ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে শুরু করে কাফন-দাফনের সব খরচ বহনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর আসেননি।

জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খোকন মিয়া। তিনি হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

মৃত্যুর পরও তার মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান স্ত্রী ও দুই ছেলে।এর ফলে মরদেহটি চার দিন ধরে হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকে। মানবিক কারণে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তারা জানায়, দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই এবং মরদেহ গ্রহণেও তারা অনাগ্রহী।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জি. মো. আজহার উদ্দিন বলেন,

আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। এমনকি মরদেহ নেওয়া ও দাফনের সব খরচ বহনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই আমরা তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।তিনি আরও বলেন,এটা শুধু একটি পরিবারের ঘটনা নয়, এটি আমাদের সমাজের মানবিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।

একজন মানুষ জীবনের শেষ সময়ে অন্তত আপনজনের কাছ থেকে সম্মানজনক বিদায় পাওয়ার অধিকার রাখে।পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১ মে) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার উদ্যোগে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হয়।

পরে সেখান থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও একই ধরনের অনাগ্রহ প্রকাশ করা হয়।হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২৪ মার্চ গুরুতর সংক্রমণ (সেলুলাইটিস) নিয়ে পুলিশ খোকন মিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করে।

দীর্ঘ ৩৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। চিকিৎসাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসক ও নার্সরা তার সেবায় নিয়োজিত ছিলেন।

খোকন মিয়ার বাড়ি নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরে এবং শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের করুইন গ্রামে।

স্ত্রী নিলুফা আক্তার ও দুই ছেলে রাজু ও রানা থাকলেও জীবনের শেষ সময়ে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ।সবশেষে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যদি পরিবারের কেউ না আসে, তবে মঙ্গলবার (৫ মে) ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে তাকে বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে দাফন করা হবে।

এই ঘটনাকে স্থানীয়রা চরম মানবিক অবক্ষয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। জীবনের শেষ সময়ে একজন মানুষ যে শুধু আপনজনের সান্নিধ্য চায়—খোকন মিয়ার নিঃসঙ্গ মৃত্যু যেন সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এলো।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর