
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ভেজাল ও অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে যখন নিরাপদ খাদ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের বীররামপুর গ্রাম হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং কৃষকদের সচেতন উদ্যোগে গ্রামটি বর্তমানে ‘নিরাপদ সবজির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
গ্রামটিতে জৈব ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কৃষকরা ব্যবহার করছেন সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ আঠালো ফাঁদসহ সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) প্রযুক্তি। ফলে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত হচ্ছে।
কৃষক ইউসুফ আলী তার প্রায় দুই একর জমিতে কচুর লতি, করলা, কাকরোল, বেগুন, ঢেঁড়শ ও লাউসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপদ সবজি চাষ করছেন। তার মতো শতাধিক কৃষক বর্তমানে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। নিরাপদ পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় এসব সবজির বাজারমূল্যও তুলনামূলক বেশি পাচ্ছেন তারা।

বীররামপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। ভোর থেকে কৃষকরা ক্ষেত পরিচর্যা, ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করেন। উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, রামপুরের কচুর লতি বিশেষভাবে পরিচিত। স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করেন।
কৃষক ইউসুফ আলী বলেন, “আগে বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করতাম। এতে উৎপাদন খরচ বেশি হতো এবং পরিবেশের ক্ষতি হতো। এখন কৃষি বিভাগের পরামর্শে আইপিএম ও জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছি। এতে উৎপাদন খরচ কমেছে, গুণগত মান বেড়েছে এবং বাজারে ভালো দামও পাচ্ছি।”
ইউসুফের মা মালেকা বেগম বলেন, “আমার পরিবারের সবাই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। ছেলের কৃষি কাজে আমরা নারীরাও সহযোগিতা করি। নিরাপদ সবজি উৎপাদন করায় ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে, আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।”
বেগুন চাষি জহুর উদ্দিন বলেন, “বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদনে কিছুটা বেশি যত্ন নিতে হয়। তবে বাজারে এর চাহিদা বেশি থাকায় আমরা লাভবান হচ্ছি। কৃষিকাজ করেই ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করেছি।”
কচুর লতি চাষি ইবরাহিম খলিল বলেন, “রামপুরের কচুর লতির আলাদা সুনাম রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে ক্ষেত থেকেই লতি কিনে নিয়ে যান। নিরাপদ পদ্ধতিতে চাষ করায় ক্রেতাদের আস্থা ও চাহিদা দুটোই বেড়েছে।”
ত্রিশাল উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা হাম্মিম জাহান বলেন, “রামপুর ইউনিয়নের বীররামপুর গ্রামকে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের একটি মডেল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
ইতোমধ্যে গ্রামটি বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি গ্রাম হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আইপিএম প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আশা করছেন, বীররামপুরের এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও নিরাপদ সবজি চাষ সম্প্রসারণে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
কৃষক, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বীররামপুর ইতোমধ্যে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
খাগড়াছড়িতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত
খাগড়াছড়িতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ...
খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা জনপ্রতিনিধি ও কৃতী ব্যক্তিদের সংবর্ধনা
খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা জনপ্রতিনিধি ও কৃতী ব্যক্তিদের...
শার্শায় ৩২টি পূজা মণ্ডপে নুরুজ্জামান লিটনের নিজস্ব অর্থায়নে...
শার্শায় ৩২টি পূজা মণ্ডপে নুরুজ্জামান লিটনের...
টিনের ঘরে মাশরুম চাষ, ইউটিউব দেখে ৩ বন্ধুর...
টিনের ঘরে মাশরুম চাষ, ইউটিউব দেখে...
শেরপুরের বনভূমিকে বন্যহাতির নিরাপদ আবাস-’ল হিসেবে গড়ে তোলার...
শেরপুরের বনভূমিকে বন্যহাতির নিরাপদ আবাস-’ল হিসেবে...
জয়পুরহাটে সনাতন ধর্মের শ্রমিকদের মাঝে পূজার উপহার বিতরণ
জয়পুরহাটে সনাতন ধর্মের শ্রমিকদের মাঝে পূজার...