ত্রিশালে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের অর্থ লুটের অভিযোগ

প্রকাশিত: ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ , ১১ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 4 months আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

সরকারি ভাতাভোগীদের মোবাইল নম্বর গোপনে পরিবর্তন করে তাদের প্রাপ্য অর্থ অন্যের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা সমাজসেবা অফিসকে ঘিরে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, আবেদনের সময় তারা যে মোবাইল নম্বর জমা দিয়েছেন, পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে সেই নম্বর পরিবর্তিত হয়ে অন্য ব্যক্তির নম্বর যুক্ত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত উপকারভোগীরা সরকারি ভাতার টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আর অর্থ চলে যাচ্ছে অন্যের হিসাবে।

এমন অভিযোগ নিয়ে নিয়মিত সমাজসেবা অফিসে ছুটছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, সমাজসেবা অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় পর্যায়ের ইউপি সদস্যদের একটি চক্রের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এ অনিয়ম চলছে। টাকা নিয়ে ভাতার কার্ড করে দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কার্ডে যুক্ত মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন নম্বর সংযুক্ত করা হচ্ছে। পরে ভুক্তভোগীরা টাকা না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে গেলে আবার অর্থের বিনিময়ে সংশোধনের নামে নতুন ভোগান্তিতে ফেলা হচ্ছে।

সম্প্রতি এমনই এক অভিযোগ করেছেন উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের কাকচর গ্রামের বাসিন্দা ফজিলা খাতুন। তিনি তার প্রতিবন্ধী ছেলে সুমন মিয়ার নামে বরাদ্দকৃত ভাতার অর্থ অন্য একটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে চলে যাওয়ার অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য আবেদন করার সময় ফজিলা খাতুন তার নিজের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর জমা দেন। কিন্তু ২০২৬ সালে সমাজসেবা অফিসে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার ছেলের নামে বরাদ্দকৃত ভাতার টাকা নিয়মিত জমা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী মোক্ষপুর ইউনিয়নের রোকসানা খাতুন নামের এক নারীর মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে। রোকসানা খাতুনের ঐ মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়।

ফজিলা খাতুনের দাবি, আবেদনপত্রে দেওয়া নম্বরের সঙ্গে বর্তমানে ব্যবহৃত নম্বরের কোনো মিল নেই। বিষয়টি জানার পর তিনি একাধিকবার সমাজসেবা অফিসের হাবিবের সাথে যোগাযোগ করলেও কার্যকর কোনো সমাধান পাননি। এমনকি মোবাইল নম্বর সংশোধনের আবেদন করার পরও ভাতার টাকা আগের নম্বরেই পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভাতার কার্ড করে দেওয়ার জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহজাহান মুরাদ তার কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। তবে টাকা অন্যের হিসাবে যাওয়ার বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি।

ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী সুমন মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “কয়েক বছর আগে মাছ ধরতে গিয়ে শিং মাছের কাঁটায় আমার হাতে আঘাত লাগে। পরে ক্ষতস্থানে পচন ধরায় চিকিৎসকদের পরামর্শে আমার একটি হাত কেটে ফেলতে হয়। আমার পরিবারে উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই। বাবা-মা বৃদ্ধ, আর স্ত্রী ও তিন কন্যাসন্তান নিয়ে আমি চরম অসহায় অবস্থায় পড়ে যাই। পরে স্থানীয় এক মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রতিবন্ধী কার্ড করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ভাতা পাইনি। অভাবের তাড়নায় বর্তমানে স্বল্প বেতনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে লিফট অপারেটর হিসেবে কাজ করছি।”

বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে স্থানীয়রা জানান, সমাজসেবা অফিসের কিছু কর্মচারী ও স্থানীয় কয়েকজন ইউপি সদস্যের যোগসাজশে একটি ইউনিয়নের ভাতাভোগীদের টাকা অন্য ইউনিয়নের ইউপি সদস্যদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে স্থানান্তর করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে সিম নিবন্ধন করে ভাতার অর্থ আত্মসাতের এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়রা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য শাহজাহান মুরাদ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও অন্যের নম্বরে টাকা যাওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি জানতে পেরেছেন বলে দাবি করেন।

ত্রিশাল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তির নামে আমাদের দপ্তরের নথিতে দুটি ভাতার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি হিসাবে নিয়মিত ভাতার টাকা যাচ্ছে, যে হিসাবটিতে ভাতার অর্থ পাঠানো হচ্ছে, সেখানে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর হিসেবে ০১৮৮৩-৮২৯৯২ উল্লেখ আছে। নাম্বার পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ আবেদন গুলো বাহির থেকে করে। এতে মোবাইল নাম্বার পরিবর্তন ও একই ব্যক্তির নামে একাধিক আবেদন পড়াই এমনটি হতে পারে। তবে অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, “আমি লিখিত অভিযোগটি পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টির বিস্তারিত জানব। তদন্তে যদি কারও অনিয়ম বা দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর