
শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুরঃ ভোরের আলো ফুটতেই হাতে দা নেন আহালু। কোমরে বাঁধেন দড়ি। কাঁধে তুলে নেন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। তারপর বেরিয়ে পড়েন কাজের উদ্দেশে। গন্তব্য কখনো নকলার কোনো গ্রাম। কখনো পাশের উপজেলা। আবার কখনো জেলার বাইরের কোনো জনপদ।
গন্তব্যে পৌঁছেই মুহূর্তের মধ্যে উঠে যান আকাশছোঁয়া নারকেল গাছের মাথায়। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে দৃশ্যটি রীতিমতো শ্বাসরুদ্ধকর। কিন্তু আহালুর কাছে এটাই প্রতিদিনের কর্মজীবন। নারকেল গাছের চূড়াই যেন তার রুটিরুজির ঠিকানা।
৪৭ বছর বয়সী আহালু। শেরপুরের নকলা উপজেলার গনপদ্দী ইউনিয়নের বাড়ইকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত আব্দুস ছালামের ছেলে। প্রায় ১৫ বছর ধরে পেশাদার গাছি হিসেবে নারকেল গাছ পরিষ্কার, শুকনো ডাল অপসারণ ও পরিচর্যার কাজ করছেন।
জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই পেশায় টিকে আছেন। এই কাজের আয়ের ওপরই নির্ভর করছে তার পুরো পরিবার। আহালুর সংসারে স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে। দারিদ্র্যের কারণে ছেলেরা কেউ বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেনি। বড় ছেলে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন।
মেজ ছেলে কোরআনের হাফেজ। মেজ ও ছোট ছেলে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সবচেয়ে ছোট মেয়েটি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনা, সংসারের খরচ, চিকিৎসা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে আহালুর এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশার আয়।
আহালু জানান, বোরো ও আমন মৌসুমে ধান রোপণ ও কাটার কাজ করেন। বছরের বাকি সময় নারকেল গাছ পরিষ্কার করেন।
তিনি বললেন, ‘আগের মতো প্রতিদিন এত গাছে উঠতে পারি না। এখন মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। আগে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছি। বয়স বাড়ছে। শরীরের শক্তি ও সাহসও আগের মতো নেই। তাই আয়ও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।’
নকলার পূর্বাঞ্চলে নারকেল গাছ বেশি হওয়ায় সেখানে কাজও বেশি পাওয়া যায়। এখন আর তিনি শুধু নকলাতেই সীমাবদ্ধ নন। স্থানীয় এক যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কাজের ছবি ও মোবাইল নম্বর প্রকাশ করার পর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও কাজের ডাক আসে।
বছরে অন্তত দুই থেকে তিন মাস জেলার বাইরে অবস্থান করেন। একেক এলাকায় টানা ১০ থেকে ১২ দিন থেকে কাজ করেন। একটি গাছ পরিষ্কার করতে সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকা নেন।
তবে শহরাঞ্চলে বিদ্যুতের লাইনের পাশে বা ঝুঁকিপূর্ণ গাছে কাজ করলে গাছপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত পান। নকলা উপজেলায় বর্তমানে ১২ থেকে ১৪ জন পেশাদার গাছি রয়েছেন।
তাদের মধ্যে বাড়ইকান্দির কডা মিয়া, গফুর মিয়া, ছাইফুল, কিংকরপুরের ছাইদুল ইসলাম ও মেদীরপাড়ার হাকিম মিয়া উল্লেখযোগ্য। তাদের অধিকাংশেরই প্রধান জীবিকা এই পেশা।
স্থানীয় সাংবাদিক সেলিম রেজা বললেন, ‘আহালুর প্রতিটি আয় আসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। প্রতিবার গাছে ওঠার সঙ্গে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। তবু সংসারের প্রয়োজনেই তিনি এই পেশা ছাড়তে পারেননি।’
আগে নারকেল গাছ বেশি ছিল। গাছির সংখ্যা ছিল কম। তাই তাদের চাহিদা ও মজুরি দুটোই বেশি ছিল। এখন গাছ কমেছে। গাছির সংখ্যা বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় আয়ও কমে গেছে।’—জানালেন আরেকজন।
ভূরদী কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ্জ মো. ছায়েদুল হক বললেন, ‘আহালুর গল্প শুধু একজন গাছির গল্প নয়। এটি গ্রামীণ বাংলাদেশের অসংখ্য নীরব শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, সাহস ও আত্মমর্যাদার গল্প।
প্রতিটি গাছে ওঠার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেন, জীবিকার জন্য মানুষ কত বড় ঝুঁকি নিতে পারে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান বললেন, ‘আহালুর মতো গাছিরা আছেন বলেই কৃষকরা সময়মতো নারকেল গাছ পরিষ্কার করতে পারেন।
এতে গাছ সুস্থ থাকে। ফলন বাড়ে। নারিকেল চাষেও কৃষকদের আগ্রহ বজায় থাকে। স্থানীয় চাহিদা পূরণেও এসব গাছির অবদান গুরুত্বপূর্ণ।’
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
পাইকগাছায় গাঁজাসহ দুই যুবক আটক
পাইকগাছায় গাঁজাসহ দুই যুবক আটক
বাকেরগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জব্দকৃত কারেন্ট জাল পুড়িয়ে...
বাকেরগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জব্দকৃত কারেন্ট...
সাপাহারে শিরন্টি ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শাহজাহান আলীর গণসংযোগ
সাপাহারে শিরন্টি ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শাহজাহান...
শেরপুর ডপস সদস্যদের মূল্যায়ন পরীক্ষা ও শিক্ষা উপকরণ...
শেরপুর ডপস সদস্যদের মূল্যায়ন পরীক্ষা ও...
শেরপুর পূজা উদযাপন ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এমপি রাশেদের...
শেরপুর পূজা উদযাপন ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে...
জনপ্রিয়তার শীর্ষে ইমদাদুল হক ইমদাদ: বেনাপোলে বইছে পরিবর্তনের...
জনপ্রিয়তার শীর্ষে ইমদাদুল হক ইমদাদ: বেনাপোলে...