
হাফিজুল নিলুঃ দশ বছর আগে বাঁচার জন্য ৪ কিলোমিটার দূরে ওই খায়ের চেয়ারম্যানের অত্যাচারে ভিটেবাড়ি বেচে আরেক গ্রামে এসে বাড়ি বানিয়েছি, তাও আমার স্বামীরে বাঁচতে দিল না। এখন আমার এই ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা নিয়ে কী করব? ওর বাপ-দাদা সব গেল।’ শিশু পুত্রকে কোলে নিয়ে এভাবেই চিৎকার করে কাঁদছিলেন প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত নড়াইল সদর উপজেলার সিংগাশোলপুর ইউনিয়নের বড়কুলা গ্রামের তাহাজ্জুদ হোসেনের স্ত্রী সুমি বেগম।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোরে উপজেলার বড়কুলা গ্রামে প্রতিপক্ষের হামলা ও পাল্টা হামলায় মোট ৪ জন নিহত হন। যদিও দুপুর পর্যন্ত ৫ জন নিহতের খবর ছড়িয়েছিল, তবে সন্ধ্যায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪ জন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতরা হলেন খলিল শেখ গ্রুপের তাহাজ্জুদ হোসেন, তাঁর পিতা খলিল শেখ ও একই পক্ষের ফেরদৌস হোসেন।
এছাড়া সাবেক চেয়ারম্যান খায়ের গ্রুপের ওসিবুর মিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। তারা খুলনা, যশোর ও নড়াইল জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহতদের মরদেহ সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। নড়াইল জেলা পুলিশের এক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
এদিন সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড়কুলা গ্রাম পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা ঘিরে রেখেছে। খলিল শেখের বাড়ির সামনে আসতেই দেখা গেল রাস্তার ওপর পড়ে রয়েছে তাঁর লাশ। কিছুদূর পরই একইভাবে পড়ে আছে ফেরদৌস হোসেনের লাশ। বাড়ির ভেতর উঠানে পড়ে রয়েছে তাহাজ্জুদ হোসেনের লাশ। স্বজন ও এলাকাবাসীর আর্তনাদ ও কান্নায় ভারী হয়ে আছে চারপাশ।
নিহত তাহাজ্জুদ হোসেনের বোন ও ফুফুসহ স্বজনদের একটাই দাবি খুনি খয়ের চেয়ারম্যান ও তার সহযোগীদের ফাঁসি চাই। তারা জানান, প্রায় চার কিলোমিটার দূরের তারাপুর গ্রাম থেকে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই খায়ের চেয়ারম্যানের লোকেরা বড়কুলা গ্রামে এসে চড়াও হয়। তারা ঘর থেকে বের করে ৩ জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে চলে যায়। চোখের পলকে কী হয়ে গেল, তা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না স্বজনরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক পক্ষের নেতা সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা ওরফে খায়ের এবং অন্য পক্ষে আছেন সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল শেখ (তার বাড়ি ইউনিয়নের অন্য প্রান্তে গোবরা গ্রামে)। বর্তমানে শেখ বংশের হাল ধরেছিলেন তারাপুর গ্রামের খলিল শেখ। গত বিশ বছরে এই দুই পক্ষের মধ্যে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ বার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং ইতিপূর্বে একাধিক খুনের ঘটনাও রয়েছে।
মাসখানেক আগে নড়াইল কোর্টে মামলার হাজিরা দিতে যাওয়ার পথে চুনখোলা মোড়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারিতে ৮ জন আহত হয়েছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা এবং সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল শেখ বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও তাদের কোনো দলীয় পদ-পদবি নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি একবার একই মঞ্চে বসিয়ে দুজনের বিবাদ মিটিয়ে দিয়েছিলেন। সে সময় তারা ওই এমপির ছত্রছায়ায় থাকতেন।
তবে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে তারা আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বর্তমানে উজ্জ্বল চেয়ারম্যান একটি মামলায় জেলে আছেন। এবারের নির্বাচনে তারা নড়াইল-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
নড়াইলের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আল মামুন শিকদার বলেন, ‘সামাজিক আধিপত্যের জেরে হামলার ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন এবং প্রতিপক্ষের একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
সোনাগাজীর নবাবপুরে মাদকবিরোধী র্যালি ও আলোচনা সভা
সোনাগাজীর নবাবপুরে মাদকবিরোধী র্যালি ও আলোচনা...
ফেনীতে রোড সাইন চুরির দায়ে একজন গ্রেপ্তার
ফেনীতে রোড সাইন চুরির দায়ে একজন...
‘সৃজনশিখা’ আয়োজিত শার্শায় যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির জমজমাট লড়াই...
‘সৃজনশিখা’ আয়োজিত শার্শায় যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির...
মধুখালীতে বেঙ্গল ইসলামী লাইফের মৃত্যুদাবির চেক হস্তান্তর
মধুখালীতে বেঙ্গল ইসলামী লাইফের মৃত্যুদাবির চেক...
কমলগঞ্জে ধলাই নদীতে বিষ প্রয়োগে মাছ নিধনের অভিযোগ
কমলগঞ্জে ধলাই নদীতে বিষ প্রয়োগে মাছ...
বেনাপোল বন্দরে একসেস প্রকল্পের ইআইএ প্রস্তুতিতে গণশুনানি ও...
বেনাপোল বন্দরে একসেস প্রকল্পের ইআইএ প্রস্তুতিতে...