মৃত্যুর দেড় মাস পর সৌদি প্রবাসীর মরদেহ দেশে, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী পরিবেশ

প্রকাশিত: ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ , ১০ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার , পোষ্ট করা হয়েছে 3 months আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

জীবিকার তাগিদে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রায় দেড় বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের মধ্য ভাটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. তুহিনুজ্জামান (৩৪)। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—সংসারের স্বপ্ন পূরণের আগেই কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হয় তাকে। মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস পর দীর্ঘ প্রশাসনিক ও কনস্যুলার প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে দেশে ফিরেছে তাঁর মরদেহ।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় বছর আগে সৌদি আরবের হাইল শহরে Thamer Mohsen Trading Establishment-এর ভিসায় দেশটিতে যান তুহিনুজ্জামান। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি।

এক পর্যায়ে  এসি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতে যেয়ে ওপর থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে সাত দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বাংলাদেশে ঈদুল আজহার আগের দিন, অর্থাৎ সৌদি আরবে ঈদের দিন (২৭ মে) তিনি মারা যান।

দীর্ঘ প্রশাসনিক ও কনস্যুলার প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় তাঁর মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ গ্রহণ করেন তাঁর স্ত্রী ফরিদা খাতুন।

মরদেহবাহী কফিনটি সামনে আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী ফরিদা খাতুন। স্বামীর কফিন জড়িয়ে ধরে বারবার বিলাপ করতে থাকেন তিনি। এ সময় স্বজনদের হৃদয়বিদারক আহাজারিতে বিমানবন্দরের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। উপস্থিত অনেকেই অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ফরিদা খাতুন বলেন, “মানুষটা বলেছিল, আর কয়েক বছর কষ্ট করলেই সংসারের সব অভাব দূর হবে। সন্তানদের জন্য সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ গড়বে। কিন্তু সে আর ফিরে এসে সেই কথা রাখতে পারল না। এখন আমার ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব, জানি না।”

মৃত্যুকালে তুহিনুজ্জামান বাবা-মা, স্ত্রী ফরিদা খাতুন, আট বছর বয়সী মেয়ে তাকিয়া খাতুন তামান্না এবং দুই বছর বয়সী ছেলে আব্দুল্লাহ আল তাওসীফ রেখে গেছেন।

স্বজনরা জানান, তুহিনুজ্জামান ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এর আগে কয়েক বছর বিদেশে কাজ করলেও আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। পরে ঋণ করে আবারও সৌদি আরবে যান পরিবারের ভাগ্য বদলানোর আশায়। কিন্তু ঋণের বোঝা কমিয়ে পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আগেই দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রায় দেড় মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই সময়টুকু তাদের জন্য ছিল চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক কষ্টের।

শুক্রবার (১০ জুলাই) জুমার নামাজের পর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

প্রতিবছর জীবিকার সন্ধানে লাখো বাংলাদেশি প্রবাসে পাড়ি জমান। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, দুর্ঘটনা ও নানা প্রতিকূলতায় অনেক প্রবাসীকেই অকালে প্রাণ হারাতে হয়। তুহিনুজ্জামানের মৃত্যু সেই বেদনাদায়ক বাস্তবতার আরেকটি মর্মস্পর্শী উদাহরণ হয়ে রইল।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর