
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি খাতে ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এ খাতে দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশে অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যখন বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তখন বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে অপ্রচলিত বাজার। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বলছে, অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। অবশ্য সার্বিকভাবে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বাড়লেও রাশিয়া, ইউএই, মালয়েশিয়ার মতো বাজারে কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। আর তাই, নতুন বাজারে আরও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা।
ইপিবির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখনও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট আরএমজি রপ্তানির ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ১৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। কানাডা ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার এবং ৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
আলাদাভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইইউ বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং কানাডায় ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ। এছাড়া যুক্তরাজ্যে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানি, যেখান থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। এরপর তালিকায় যথাক্রমে রয়েছে স্পেন (৩ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার), ফ্রান্স (২ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার), নেদারল্যান্ডস (২ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার), পোল্যান্ড (১ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার), ইতালি (১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার) এবং ডেনমার্ক (১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার)।
কিছু ইউরোপীয় দেশে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যেমন নেদারল্যান্ডসে ২১ দশমিক ২১ শতাংশ, সুইডেনে ১৬ দশমিক ৪১ শতাংশ, পোল্যান্ডে ৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
এদিকে নন-ট্র্যাডিশনাল বা অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের সার্বিক আরএমজি রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ; মোট রপ্তানি আয় এসেছে ৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এই বাজারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত। এর মধ্যে তুরস্কে রপ্তানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ৬২ শতাংশ, ভারতে রপ্তানি বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং জাপানে রপ্তানি বেড়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
তবে, উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রাশিয়া, কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মালয়েশিয়ায় বাজার ঘিরে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে এ বাজারগুলোতে। এর মধ্যে রাশিয়ায় রপ্তানি আয় ১০ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৩২ মিলিয়ন ডলারে এবং মালয়েশিয়ায় ১১ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ১৮৯ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে রপ্তানি আয়। তবে এসব অঞ্চলে আবারও প্রবেশের সুযোগ রয়েছে যদি বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কম দামে পোশাক সরবরাহ করে এ বাজারে টিকে থাকা যাবে না। বরং উচ্চ মানসম্পন্ন ও নতুন ডিজাইনের পোশাক, টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী অথচ পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়া— এসবই হতে হবে ভবিষ্যতের মূল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের চাহিদা ও বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ট্র্যাডিশনাল বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশই এই বাজার থেকে আসে। তবে, নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারের অংশীদারিত্ব এখনো তুলনামূলক কম, যা মাত্র ১৬ শতাংশ।
ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক পোশাক বাজারের আকার ছিল প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারের আকার ছিল প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারে ৬ শতাংশ অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে, যেখানে আরও বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৪ সালে জাপানের মোট পোশাক আমদানির ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার মোট আমদানির ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে বাংলাদেশ থেকে; যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে নতুন বাজার ও নতুন পণ্যের দিকে মনোযোগী হতে হবে। নতুন বাজারে প্রবেশ এবং উদ্ভাবন শুধু কৌশলগত বিষয় নয়, এটি বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি অপরিহার্যতা। আমাদের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাজার বৈচিত্র্য এবং সম্প্রসারণের দিকে এগোতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, অগ্রগতি ধরে রাখতে আমাদের পণ্য উদ্ভাবন, বৈচিত্র্য ও চাহিদা অনুযায়ী বাজারভিত্তিক নতুন ডিজাইন এবং পণ্য উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। এছাড়া অপ্রচলিত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণে এফটিএ বা পিটিএ চুক্তি করা যেতে পারে। বাংলাদেশি পোশাককে ‘গুণগত মান ও ন্যায্যমূল্যের প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরতে হবে।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
যশোর চৌগাছার চাঞ্চল্যকর ঝন্টু হত্যা’র প্রধান আসামি আবু...
যশোর চৌগাছার চাঞ্চল্যকর ঝন্টু হত্যা’র প্রধান...
গৃহপরিচারিকা থেকে প্রতিমন্ত্রী হলেন কলিতা
গৃহপরিচারিকা থেকে প্রতিমন্ত্রী হলেন কলিতা
উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন শি জিনপিং, কিমের আমন্ত্রণে বিরল...
উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন শি জিনপিং, কিমের...
তাপপ্রবাহে পুড়ছে ১৭ অঞ্চল, সপ্তাহজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির আভাস
তাপপ্রবাহে পুড়ছে ১৭ অঞ্চল, সপ্তাহজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির...
লাইভে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা দিয়ে পুলিশ বাবাকে ‘মিথ্যাবাদী’...
লাইভে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা দিয়ে পুলিশ...
এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৩৫ হাজার
এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ...