দেশে দিনে গড়ে ৪১ জনের আত্মহত্যা, বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশিত: ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ , ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার , পোষ্ট করা হয়েছে 4 months আগে
ফাইল ছবি

প্রতিদিনই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, যা ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে সারাদেশে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ হাজার ৪৯১ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন ৪১ জন। ডিসেম্বর মাসের পরিসংখ্যান এখনো প্রস্তুত না হওয়ায় সেই তথ্য যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অর্থায়নে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত জাতীয় জরিপে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫০৫ জন। পুলিশের হিসাব বলছে, ২০২৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৯২০ জনে।

সম্প্রতি আত্মহত্যার ঘটনায় নিহত নারী-পুরুষের ১০টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পেছনে কাজ করেছে পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ, মানসিক জটিলতা ও দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা। আশঙ্কার বিষয় হলো—তাঁদের কেউই মানসিক চাপ বা বিষণ্নতার জন্য পেশাদার চিকিৎসা নেননি।

সর্বশেষ সোমবার গাজীপুরের পুবাইল এলাকায় রেলক্রসিংয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন হাফেজা খাতুন মালা (৩৫)। এর আগে ১৬ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর বড় মগবাজারে দাম্পত্য কলহের জেরে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ শম্পা আক্তার রিভা (২৬)। শুধু ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি—এই দুই দিনেই ঢাকায় অন্তত ছয়টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

আত্মহত্যার আগে স্বামী সুমনের মোবাইল ফোনে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান শম্পা। সেখানে তিনি দাম্পত্য জীবনের মানসিক কষ্ট ও অবহেলার কথা উল্লেখ করেন, যা পরে সামাজিকভাবে আলোচনার জন্ম দেয়।

মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার কারণে গত শনিবার খিলগাঁওয়ে আত্মহত্যা করেন ব্যাংক কর্মকর্তা শাহানুর রহমান (৪৪)। তাঁর পরিবার জানায়, স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ও আর্থিক চাপ তাকে দীর্ঘদিন মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আত্মহত্যা কখনোই একক কোনো কারণে হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে জমতে থাকা একাধিক মানসিক ও সামাজিক চাপ একজন মানুষকে এই চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। সময়মতো বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা পেলে অনেক ক্ষেত্রেই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।”

সম্পর্কজনিত জটিলতা আত্মহত্যার অন্যতম বড় কারণ হিসেবেও উঠে এসেছে। ১৭ জানুয়ারি রাতে মিরপুরে কলেজ শিক্ষার্থী সানজিদা ইসলাম মিম (১৯) আত্মহত্যা করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের সম্পর্কে বিশ্বাসভঙ্গ ও মানসিক আঘাতই ছিল এর পেছনের প্রধান কারণ।

এ ধরনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন,“কার্যকর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার অভাবে সংকটে পড়া মানুষ নিজেকে একা মনে করে। সম্পর্কের ভাঙন, আর্থসামাজিক অনিশ্চয়তা ও সহানুভূতির অভাব অনেককে মৃত্যুকেই মুক্তি হিসেবে ভাবতে বাধ্য করে।”

পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক ও মানসিক সংকটে দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি। কমিউনিটি পুলিশিং, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব। তিনি বলেন, আত্মহত্যার ঝুঁকির তথ্য পেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ দ্রুত পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়—এটি একটি সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। সময়মতো সহানুভূতি, চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই অকাল মৃত্যু অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।