ফেনীতে টানা ভারী বর্ষণে ফের বন্যার শঙ্কা, আতঙ্কে নদীতীরের মানুষ

প্রকাশিত: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ , ৮ জুলাই ২০২৬, বুধবার , পোষ্ট করা হয়েছে 3 months আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

আবুল হাসনাত তুহিন ফেনীঃ টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় আবারও বন্যার প্রহর গুনছে ফেনীবাসী। জেলার মুহুরী, ফেনী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নদীতীরবর্তী এবং নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। গত বছরের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো তাজা থাকায় সম্ভাব্য নতুন দুর্যোগ নিয়ে উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, ভারতের ত্রিপুরা এবং মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েক দিন ধরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

উজানে ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায় মুহুরী, ফেনী, সিলোনিয়া, হালদাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে ফেনীসহ কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ফেনী জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্র চালু, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফেনী সদর ও সোনাগাজী উপজেলার নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে অনেক স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এসব এলাকার কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

ফুলগাজী উপজেলার এক বাসিন্দা বলেন, “গত বছরের বন্যায় আমাদের ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। এবার আবার একই পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, সেই আতঙ্কে আছি।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। বজ্রসহ বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও দমকা হাওয়াও বয়ে যেতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের অধিকাংশ বড় নদী এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে স্থানীয়ভাবে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে মুহুরী ও ফেনী নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ও নদীর তীরের বিভিন্ন অংশে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনে দ্রুত সংস্কার কাজ পরিচালনার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। এছাড়া মাইকিংয়ের মাধ্যমে নদীতীরবর্তী জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময়ে অতিবৃষ্টি হলে আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত এবং মৎস্য খাতের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে কৃষকদের আগাম সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ, অপ্রয়োজনীয়ভাবে নদীতে না নামা, শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদ স্থানে রাখা এবং জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে ফেনীসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ওই বন্যায় দেশের ১১টি জেলার প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৫ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হন। ফেনী, কুমিল্লা ও নোয়াখালী ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে।

বন্যার সময় ফেনীসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় হাজার হাজার বসতঘর, সড়ক, সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাছের ঘের ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পূর্বাঞ্চলের বন্যায় সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ৪২১ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ফেনীর মুহুরী, ফেনী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি। অন্যথায় টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে ভবিষ্যতেও ফেনীকে একই ধরনের দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর