
শাহরিয়ার মিল্টন,শেরপুর : ধানের জেলা শেরপুর। অনেক আগ থেকেই এ জেলা ধান উদ্বৃত্ত অঞ্চল ও চালের খ্যাতি দেশব্যাপি। ব্যাপক ধান উৎপাদন হয় বলে স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে এখানে চাতাল ব্যবসার প্রসার ঘটে।
একসময় চাতাল ব্যবসাকে ঘিরেই শেরপুরের অর্থনীতি ছিল রমরমা । এখানে বহু মানুষ কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে চাতালগুলো কমতে থাকে। এখন আগের মতো আর চাতাল নেই, ফলে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন অনেক শ্রমিক। কিছু কিছু জায়গায় চাতালকল ভেঙে কেউ বাড়ি বানাচ্ছেন, কেউবা দিচ্ছেন দোকান। আবার অনেকেই ফেলে রেখেছেন। ব্যবসায় মন্দা ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশাহারা ব্যবসায়ীরা।
চাতালে কাজ করা অনেক নারী-পুরুষ বেকার হয়েছেন। টিকে থাকার সংগ্রামে কেউবা পেশা বদলে ফেলেছেন। এ ছাড়া বেকারত্বের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন বহু শ্রমিক।
চাতালকলের জন্য বিখ্যাত দিঘারপাড়ে সম্প্রতি গিয়ে দেখা গেছে, কমপক্ষে ৫০ থেকে ৬০টি চাতাল ভেঙে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে যে চাতালগুলো টিকে আছে, সেগুলোও প্রায় বন্ধের পথে। তাই কোনোমতে টিকে থাকা চাতালে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শ্রমিকরা।
চালকল মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, একসময় শেরপুরের পাঁচ উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ১শ চাতাল ছিল। তবে বর্তমানে কোনোমতে টিকে আছে মাত্র ১শ থেকে ১ শ ৫০টি চাতাল । আধুনিক জীবনে যান্ত্রিকতার ছোঁয়া ও নানা প্রতিকূলতায় এ শিল্পটি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। গত পাঁচ থেকে সাত বছরে এ ব্যবসায় চলছে চরম মন্দা।
বিশেষ করে অটোরাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে চাতালগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া মূলধনস্বলতাও চাতাল বন্ধের অন্যতম কারণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯০ সালে শেরপুর পৌরশহরের মোবারকপুর মহল্লার আখেরমামুদ বাজারে চাতাল ও মিল স্থাপন করেন ছামিদুল হক কেনা। সেই কলের শ্রমিক খলিল মিয়া বলেন, ‘এ চাতালেই আমরা হাসকি ও বয়েল চাল করতাম।
এখানে আমি ছাড়া আরও ১২ জন প্রায় ২০ বছর কাজ করেছি। পরবর্তী সময়ে শহরে অটো চাউল মিলে কাজ নিয়েছি। ২০২২ সালে চাতালটি ভেঙে কলার বাগান করা হয়।’
এ বিষয়ে ছামিদুল হক কেনা বলেন, ‘আমি নিজে ব্যবসা করতাম না। ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করতাম। জমজমাট ব্যবসা হতো, বছর না ঘুরতেই ভাড়ার জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখতেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু অটোরাইস মিল আসার পর কেউ ভাড়াও নিতে চায় না। তাই জমিটা ফেলে না রেখে কলার বাগান করেছি।’
ছামিদুল হক কেনার মতো ১৯৯৫ সালে পৌরশহরের মোবারকপুর নয়াপাড়ায় সাইফুল্লাহ মুকুল ৩শ মণ ধানের জন্য চাতাল কল ও মিল স্থাপন করেন। কিন্তু বর্তমানে তা বন্ধ। তার ছেলে সাজিবুর রহমান বলেন, ‘২০১৫ সাল পর্যন্ত আমরা দারুণ ব্যবসা করেছি। মৌসুমের শুরুতে শ্রমিকদের অগ্রিম টাকা ও নতুন লুঙ্গি-গেঞ্জি দিয়ে চাতালের চুলায় আগুন দিতাম।
কিন্তু ২০১৫ সালের পর ধীরে ধীরে ব্যবসায় ধস নামতে শুরু করে। এর কারণ অটোরাইস মিল। এসব মিলে হাজার মণ চাল উৎপাদন হতো। আমরা তাদের সঙ্গে টাকার অভাবে তাল মেলাতে না পারায় ব্যবসায় টিকতে পারিনি। ২০২০ সালে ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হই আমরা।’
১৯৯২ সালে আখের মামুদ বাজারে চাতাল মিল ও চাতাল স্থাপন করেন মকবুল হোসেন। ভালো ব্যবসা হওয়ায় ২০০৫ সালে আরেকটি ৫শ মণের চাতাল করেন। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভালো ব্যবসা হলেও পরবর্তী সময়ে ব্যবসায় লোকসান গুনতে হয়েছে। মরহুম মকবুল হোসেনের ছেলে জাকির মোল্লা বলেন, ‘প্রায় দুই যুগের বেশি সময় জমজমাট ব্যবসা হলেও ২০১৬ সালের পর অটোরাইস মিলের সঙ্গে আমরা তাল মেলাতে পারিনি।
১ হাজার মণ চাল তৈরিতে আমাদের বেশ কয়েক দিন সময় লাগলেও অটোমিলে কয়েক ঘণ্টায় চাল প্রস্তুত হয়ে যায়। তাই আমাদের ব্যবসায় ধস নামে। এখন চাতাল ভেঙে করাতকল করেছি। শুধু যে আমরা এমনটা করেছি তা নয়, অনেক ব্যবসায়ী আজ চাতাল ভেঙে অন্য কিছু করছেন। ব্যবসায় অনেক লোকসানও হয়েছে। আমাদের এত টাকা নেই যে, অটোরাইস মিল দেব। তাই ভেঙে ফেলেছি।’
ব্যবসায়ী আলী আযম বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ বছর ঢাকলহাটিতে ব্যবসা করেছি। ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত টুকিটাকি ব্যবসা হলেও পরে শিল্পপতিদের সঙ্গে ব্যবসায় তাল মেলাতে পারিনি। বেশ ঋণে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি।’
বরদীর পূর্ব ঝিনিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক আয়েশা বেগম জানান, আগে চাতালের অভাব ছিল না। অগ্রিম টাকা ও নতুন কাপড়চোপড় দিতো। এখন কাজ নেই বললেই চলে। একসময় তাদের গ্রামের প্রায় ২শ জন মানুষ এ পেশায় কাজ করতো। এখন মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন কাজ করেন।
জাতীয় কৃষক সমিতির শেরপুর জেলার সভাপতি রাজিয়া সুলতানা জানান, জেলায় একসময় হাজারের বেশী চাতাল থাকলেও বর্তমানে শ’খানেক চাতাল কোনোমতে টিকে আছে। যার ফলে প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। অনেক চাতাল ব্যবসায়ী এখন নিজেই দিন মজুরির কাজ করছে। সরকার যদি পৃষ্ঠপোষকতা করে তাহলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত মালিক, শ্রমিক সবারই ভাগ্য পরিবর্তন হবে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম জনউদ্যোগের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চাতালগুলোকে রক্ষা করা জরুরি। এ চাতালের কারণে শেরপুরের অর্থনীতি চাঙা ছিল। চাতালগুলো সচল থাকলে জেলার অর্থনীতি ফের চাঙা হবে। আর শ্রমিকরা ফিরে পাবেন তাদের আদি পেশা।
শেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আসাদুজ্জামান রওশন বলেন, ‘দেশের অন্যতম ধান উৎপাদনকারী জেলা শেরপুর। এ কারণে এখানে চাতালশিল্পের সমৃদ্ধি ঘটে। ফলে এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয় লাখো শ্রমিকের। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া ও নানা প্রতিকূলতায় দিন দিন ধ্বংসের পথে এ শিল্প।
একসময়ের সমৃদ্ধ চাতালশিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন। যদি সরকার প্রণোদনা দেয়, তাহলে ফের সমৃদ্ধ হবে এ জেলার চাতালশিল্প। তাই আমরা এ খাতে সরকারের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছি।’
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
ধামইরহাটে মিটারের ত্রুটির অভিযোগে ১ লাখ ৬০ হাজার...
ধামইরহাটে মিটারের ত্রুটির অভিযোগে ১ লাখ...
সাপাহার সীমান্তে নারী পুরুষ ও শিশু সহ ১৭...
সাপাহার সীমান্তে নারী পুরুষ ও শিশু...
নড়াইলের নলিয়া নদীতে নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার
নড়াইলের নলিয়া নদীতে নিখোঁজ শিশুর মরদেহ...
দুমকিতে বজ্রপাতে একজনের মৃত্যু
দুমকিতে বজ্রপাতে একজনের মৃত্যু
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু সেই গাছ কেটে সরিয়ে দিল...
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু সেই গাছ কেটে...
যশোর চৌগাছার চাঞ্চল্যকর ঝন্টু হত্যা’র প্রধান আসামি আবু...
যশোর চৌগাছার চাঞ্চল্যকর ঝন্টু হত্যা’র প্রধান...