"দুর্গাপুরের আল-রুমানের পাঠাগা"

৪১ বইয়ের ছোট্ট স্বপ্ন এখন সাত গ্রামের আলোর ঠিকানা

প্রকাশিত: ১:৩৭ অপরাহ্ণ , ২৪ আগস্ট ২০২৬, সোমবার , পোষ্ট করা হয়েছে 2 months আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

মজিবুর রহমান,নেত্রকোণা : নিজের উচ্চমাধ্যমিকের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। অসুস্থতার কারণে পরীক্ষার আগেই থেমে যেতে হয়েছিল পড়াশোনার পথ। কিন্তু থেমে যায়নি জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন। নিজের অপূর্ণতাকে শক্তিতে পরিণত করে মাত্র ৪১টি বই নিয়ে যে ছোট্ট উদ্যোগ শুরু করেছিলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুরের তরুণ আল-রুমান হাসান, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে সাত গ্রামের মানুষের জ্ঞানের বাতিঘর।

চণ্ডীগড় ইউনিয়নের পাথারিয়া গ্রামের এই তরুণের গড়ে তোলা ‘জ্ঞানের উৎস পাঠাগার’ এখন আর শুধু একটি ঘরে সাজানো কিছু বইয়ের সংগ্রহ নয়, এটি হয়ে উঠেছে শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকের মিলনস্থল। পাঠাগারে বর্তমানে রয়েছে ৩৪৭টি বই, ১৯টি ম্যাগাজিন ও নিয়মিত পত্রিকা। আশপাশের সাতটি গ্রামের মানুষের কাছেও বই পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি।

আল-রুমানের গল্পটা শুরু হয়েছিল নিজের জীবনের একটি কঠিন বাস্তবতা থেকে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারার কষ্ট তাকে ভেতর থেকে নাড়া দেয়। কিন্তু সেই আক্ষেপে নিজেকে আটকে না রেখে তিনি ভাবলেন, যে স্বপ্ন নিজের জীবনে পূরণ হয়নি, সেই স্বপ্নের আলো অন্যদের জীবনে ছড়িয়ে দেওয়া যায় কি না।
সেখান থেকেই ৪১টি বই নিয়ে পথচলা।

দিনের পর দিন মানুষের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করেছেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বই কিনেছেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংগ্রহ। বইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র, পাঠচক্র ও কুইজ প্রতিযোগিতা। দরিদ্র ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় বিনামূল্যে বই নেওয়ার সুযোগ।

পাঠাগারে আসা শিক্ষার্থীদের কাছে এটি যেন অন্য এক পৃথিবীর দরজা। পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগতকে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাদের সামনে। ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে বই পড়ার পাশাপাশি নিয়মিত পাঠচক্র ও কুইজে অংশ নিচ্ছে তারা।

তবে ‘জ্ঞানের উৎস পাঠাগার’-এর কাজ কেবল বই পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পাঠাগারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় তরুণদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হচ্ছে ফুটবল টুর্নামেন্ট, বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান। নয়নযোগী আশ্রমে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবার মতো জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

আল-রুমান উদ্যোগটিকে ব্যক্তিনির্ভর না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন। পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালনায় রয়েছে ১৩ সদস্যের পরিচালনা কমিটি ও ১৩ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি। ফলে ছোট্ট উদ্যোগটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে।

আল-রুমান হাসানের বিশ্বাস, একটি বই কখনো শুধু একটি বই নয়। একটি বই একজন মানুষের চিন্তার জগৎ বদলে দিতে পারে। আর আলোকিত একজন মানুষ বদলে দিতে পারেন একটি পুরো সমাজ।

তার ভাষায়, “একটি বই একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে। আর একজন আলোকিত মানুষ একটি সমাজ পরিবর্তনের মূল কারিগর হতে পারেন।”

এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলেছেন তিনি।
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে যখন অনেকের হাত থেকে বই দূরে সরে যাচ্ছে, তখন দুর্গাপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের একজন তরুণের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।

কোনো বড় প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই সীমিত সামর্থ্যে গড়ে ওঠা পাঠাগারটি প্রমাণ করছে পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন একটি বড় স্বপ্ন ও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাহস।

তবে আল-রুমানের স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়। তিনি চান পাঠাগারের জন্য একটি আধুনিক নিজস্ব ভবন নির্মাণ করতে। ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘জ্ঞানের উৎস পাঠাগারের শাখা প্রতিষ্ঠারও স্বপ্ন দেখেন তিনি।

পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গাইডলাইন, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং বিজ্ঞান মেলার মতো কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

৪১টি বই থেকে শুরু হয়েছিল যে পথচলা, সেটি আজ ৩৪৭টি বইয়ের সংগ্রহে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এর স্বপ্ন সাত গ্রামের মানুষের হাতে বই তুলে দিয়ে একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলা।

অসুস্থতার কাছে যে তরুণের নিজের শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন থেমে গিয়েছিল, সেই আল-রুমানই আজ অন্যদের স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাচ্ছেন। তাঁর ‘জ্ঞানের উৎস পাঠাগার’ তাই শুধু একটি পাঠাগার নয়, এটি প্রতিকূলতাকে জয় করে সমাজ বদলের এক নীরব গল্প।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর