কেন্দুয়ায় মরা গরুর মাংস নিয়ে তোলপাড় , নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন

প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ , ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 4 weeks আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

মজিবুর রহমান,নেত্রকোণা: নেত্রকোণার কেন্দুয়া পৌরশহরে মরা গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগকে কেন্দ্র করে তোলপাড় চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পর নড়েচড়ে বসেছে উপজেলা প্রশাসন। রোববার মাটির নিচে পুঁতে রাখা আলোচিত মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।

নমুনা ল্যাবে পরীক্ষার পরই মাংসটির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অভিযোগ উঠেছে, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সনাটি ইউনিয়নের আকালপাড়া গ্রামের প্রবাস চন্দ্র সূত্রধরের একটি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে গরুটিকে গোয়ালঘরে জবাই করে এক দালালের মাধ্যমে কেন্দুয়া পৌরশহরের মাংস ব্যবসায়ী আরাধনের কাছে বিক্রি করা হয়।

বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলে কেন্দুয়া ও গৌরীপুরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

অভিযোগের বিষয়ে আরাধন এক সংবাদ সম্মেলনে মাংস কেনার কথা স্বীকার করেন। তার দাবি, এক দালালের মাধ্যমে তিনি আলোচিত গরুর প্রায় ৫০ কেজি মাংস ৬ হাজার টাকায় কিনেছিলেন। পরে গরুটি মারা যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে মাংস মাটিতে পুঁতে রাখেন।

এরপর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে মাটির নিচ থেকে মাংস তুলে দেখানো হয়। সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মাংসের প্রকৃত অবস্থা ও সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

স্থানীয়দের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, দীর্ঘ সময় মাটির নিচে থাকার পরও মাংসটি কীভাবে এমন অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান বলেন, ‘২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা হিসেবে ১২ সেপ্টেম্বর মাটির নিচ থেকে মাংস উত্তোলন করা হলে সাধারণত সেটি আরও পচে যাওয়ার কথা।

মাংসের রং ও অবস্থা দেখে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছে। মাংসটি আগে ফ্রিজিং করা হয়েছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেছি। তা ল্যাবে পাঠানো হবে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই মাংসের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে আলোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দুয়ার বিভিন্ন বাজারে পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ছাড়পত্র না নেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দুয়া পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে প্রায় এক ডজন মাংসের দোকান রয়েছে।

এসব দোকানে প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১০টি গরু ও ছাগল জবাই করা হয়। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিনে জবাইয়ের সংখ্যা আরও বেড়ে যায় বলে জানা গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সুস্থতার ছাড়পত্র দেওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়মিতভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফলে জবাই করা পশু অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত ছিল কি না, তা জানার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না ক্রেতাদের।
এদিকে ঘটনার পর থেকে প্রবাস চন্দ্র সূত্রধর বাড়িঘরে তালা ঝুলিয়ে এলাকায় গাঢাকা দিয়েছেন।

কেন্দুয়া বাজারের মাংস ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরা গরুর মাংস বিক্রির যে অভিযোগ ছড়িয়েছে, ওই ব্যবসায়ী আমার ভাই।

তিনি মূলত খাসির মাংসের ব্যবসা করেন এবং মাঝে মধ্যে গরু জবাই করেন। আমার ব্যবহৃত জায়গায় ওই মাংস পুঁতে রাখা হয়েছিল। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সাংবাদিক ও পশু হাসপাতালে লোকজনকে মাংস দেখানো হয়েছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান বলেন, কেন্দুয়া উপজেলার কোনো মাংস ব্যবসায়ীরই লাইসেন্স নেই। প্রতিদিন বাজারে গিয়ে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত জনবল আমাদের নেই।

আমরা বিভিন্ন সময় মাংস ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। তবে অনেকেই ব্যস্ততার অজুহাতে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে চান না।’ তিনি আরও বলেন, অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত পশুর মাংস মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা সরল বিশ্বাসে মাংসের দোকান থেকে মাংস কিনি। যদি কোনো ব্যবসায়ী অসুস্থ বা মৃত পশুর মাংস বিক্রি করেন, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

কেন্দুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান ভূইয়া মজুন বলেন, ‘বিষয়টি কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক সানজিদা চৌধুরী বলেন, ‘আলোচিত বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।

তবে ল্যাবে পাঠানো মাংসটি প্রবাস চন্দ্র সূত্রধরের সেই গরুরই মাংস কি না, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর