
দহেন বিকাশ ত্রিপুরা, খাগড়াছড়িঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে শেষ হয়েছে সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই জনপদে ভোটের মাঠ যতটা রোমাঞ্চকর, বাস্তবতা ততটাই কঠিন। দুর্গম ভূগোল, দীর্ঘ পথ, যাতায়াত ব্যয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি আর পাহাড়ি ভোটের বিভাজন—সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ি–২৯৮ আসনের নির্বাচন এবার হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক এক চ্যালেঞ্জ।
খাগড়াছড়ির অনেক ভোটারের কাছে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোই যেন সবচেয়ে বড় লড়াই। পাহাড়ের চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা হেঁটে কেন্দ্রে যেতে হয় বহু মানুষকে। কোথাও কোথাও পাড়ি দিতে হয় পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার পথ। ফলে ভোট দিতে আগ্রহ থাকলেও বাস্তবতার কাছে হার মানছেন অনেকেই।
জেলার একমাত্র সংসদীয় আসনটি প্রায় ২ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। ৩৮টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন, অথচ ভোটকেন্দ্র মাত্র ২০৩টি। স্থানীয় নাগরিক সমাজের মতে, এই অনুপাতে কেন্দ্র সংখ্যা অপ্রতুল। ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব কমানো না গেলে পাহাড়ে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো কঠিন।
খাগড়াছড়ি সদরের সাতভাইয়াপাড়া এলাকার দিনমজুর চাইহ্লাউ মারমার পরিবারের বাস্তবতা এই সংকটকে নগ্নভাবে তুলে ধরে। সাতজন ভোটার নিয়ে তাঁর পরিবারকে ভোট দিতে গেলে যাতায়াত খরচই দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ১০০ টাকা। অনেক দরিদ্র পরিবারের জন্য এই খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
নির্বাচন কমিশনে পাঠানো জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ির ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টিই ঝুঁকিপূর্ণ, যার মধ্যে ৬৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রে ভোটার প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬২৬ জন। সবচেয়ে বেশি অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায়।
এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের সমন্বয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুর্গম তিনটি কেন্দ্রে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে—যা পাহাড়ি নির্বাচনের বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে।
রাজনৈতিক সমীকরণেও খাগড়াছড়ি বরাবরের মতো ব্যতিক্রমী। ইতিহাস বলছে, এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কখনও জয়ী হতে পারেননি। এবারও মাঠে ১১ জন প্রার্থী, যার মধ্যে তিনজন স্বতন্ত্র। দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী—ঘোড়া ও ফুটবল প্রতীকের—কারণে পাহাড়ি ভোটারদের মধ্যে আলোচনা তুঙ্গে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ি ভোটের বড় অংশ এখনও বিভক্ত। এই বিভাজনই শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলগুলোকে সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে বিএনপি এখানে এগিয়ে আছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। জামায়াতে ইসলামীও তাদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের তদারকি, গোয়েন্দা নজরদারি—সবই রয়েছে পরিকল্পনায়।
খাগড়াছড়ির নির্বাচন কেবল একটি আসনের লড়াই নয়; এটি পাহাড়ের মানুষের ভোটাধিকার, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। দুর্গমতা আর ভোট বিভাজনের এই বাস্তবতায় আগামীকাল, ১২ ফেব্রুয়ারি, ব্যালটের বাক্সই জানিয়ে দেবে—পাহাড়ের মানুষ কাকে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্ব দেয়। তবে একটাই সত্য স্পষ্ট—ভোটকেন্দ্র যতই দূরে হোক, পাহাড়ের রাজনীতি এখনও জাতীয় রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
গৃহপরিচারিকা থেকে প্রতিমন্ত্রী হলেন কলিতা
গৃহপরিচারিকা থেকে প্রতিমন্ত্রী হলেন কলিতা
উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন শি জিনপিং, কিমের আমন্ত্রণে বিরল...
উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন শি জিনপিং, কিমের...
তাপপ্রবাহে পুড়ছে ১৭ অঞ্চল, সপ্তাহজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির আভাস
তাপপ্রবাহে পুড়ছে ১৭ অঞ্চল, সপ্তাহজুড়ে ঝড়-বৃষ্টির...
লাইভে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা দিয়ে পুলিশ বাবাকে ‘মিথ্যাবাদী’...
লাইভে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা দিয়ে পুলিশ...
এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৩৫ হাজার
এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ...
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফের পদ্মায় ডুবলো বাস, চালক-হেলপার উদ্ধার
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফের পদ্মায় ডুবলো বাস,...