খাগড়াছড়িতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুফল ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা

প্রকাশিত: ৯:৩২ পূর্বাহ্ণ , ৩০ আগস্ট ২০২৬, রবিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 1 month আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ছাদভিত্তিক ও অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎকে কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায়। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

রোববার (৩০ আগস্ট) খাগড়াছড়িতে ‘ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সুফল: জনগণের জ্ঞান, ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও খাগড়াছড়ি পৌরসভার প্রশাসক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রুমানা আক্তার।

এফইডি (FED) খাগড়াছড়ির সদস্য ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রিয় কুমার চাকমার সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন পেরাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তপন বিকাশ ত্রিপুরা, ভাইবোনছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুজন চাকমা, খাগড়াছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অংপ্রু মারমা, সাংবাদিক আবু তাহের মাহমুদ ও নারী অধিকারকর্মী নমিতা চাকমা।

জাবারাং কল্যাণ সমিতির প্রোগ্রাম অফিসার বিদ্যুৎ জ্যোতি চাকমার সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য ও পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন জাবারাং কল্যাণ সমিতির প্রকল্প সমন্বয়কারী দয়ানন্দ ত্রিপুরা।

উপস্থাপনায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব তুলে ধরা হয়। আয়োজকদের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত প্রায় ৬৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর এবং প্রতিবছর জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে সভায় মত দেওয়া হয়।

সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশের আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪ কোটি ২ লাখ পরিবারের ৪১ শতাংশ বাসস্থানে অন্তত ১ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এতে প্রায় ১৬ হাজার ৩৬১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগিয়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে সভায় জানানো হয়। দেশের ১২ হাজার ৮৪৬টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়।

পরিবার পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়েও সভায় আলোচনা করা হয়। উপস্থাপনায় বলা হয়, একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। এর প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং প্রায় পাঁচ বছরে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসতে পারে বলে আয়োজকদের হিসাবে উল্লেখ করা হয়। একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল প্রায় ২৫ বছর হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে বলেও জানানো হয়।

আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ঘন জঙ্গল, বিচ্ছিন্ন বসতি এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রচলিত জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণে বাড়তি ব্যয় ও কারিগরি জটিলতা রয়েছে বলে সভায় তুলে ধরা হয়। ঝড়-বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

বক্তারা বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেখানে জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, সেখানে স্থানীয় পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা গেলে বিদ্যুতের সুবিধা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে দুর্গম বসতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভায় আরও বলা হয়, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সহজ অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর সরকারি নীতিমালা প্রয়োজন বলে মত দেন বক্তারা।

আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং দুর্গম জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

 

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর