"সাজিউড়ার খালা"

তিন দশক ধরে বটতলায় এক নারীর রহস্যময় জীবন

প্রকাশিত: ৪:১৯ পূর্বাহ্ণ , ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার , পোষ্ট করা হয়েছে 1 month আগে
ছবি- সময়ের আবর্তন।

মজিবুর রহমান, নেত্রকোণাঃ নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সাজিউড়া বাজারের বটগাছের নিচে টিনের এক চালা ছোট্ট একটি ঘর। সেই ঘরেই দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন এক বৃদ্ধা নারী। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই নারী এখন ঠিকমতো বসতে কিংবা কথা বলতেও পারেন না। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘সাজিউড়ার খালা’ নামে। তাঁর নিজের দেওয়া নাম ‘ময়না’। তবে তাঁর পরিবার, পূর্বপরিচয় কিংবা কোথা থেকে এখানে এসেছিলেন, তা আজও রহস্যই রয়ে গেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯০ সালের দিকে হঠাৎ করেই সাজিউড়া বাজারে এসে হাজির হন ওই নারী। তখন তাঁর বয়স কত ছিল, কোথা থেকে এসেছিলেন কিংবা তাঁর স্বজন কারা, এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাজারে আসার পর থেকেই তাঁর জীবনযাপন স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কখনো কাঁচা মাছ খেতেন, কখনো হাতে ঝাড়ু নিয়ে বাজার পরিষ্কার করতেন। গাছের গোড়ায় পানি দিতেন। রাতে বেলায় কোনো দোকানের বারান্দায়, আবার কখনো বাজারের কোনো এক কোণে ঘুমিয়ে রাত কাটাতেন। কেউ খাবার দিলে সেটুকুই ছিল তাঁর আহার।

এভাবেই দিনের পর দিন কাটতে থাকে। একসময় তিনি হয়ে ওঠেন সাজিউড়া বাজারের পরিচিত মুখ। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁর এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। অনেকেই তাঁকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করেন। কেউ ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা নিয়ে তাঁর কাছে আসেন, কেউ তাঁর সঙ্গে সময় কাটান, আবার কেউ আসেন শুধু তাঁকে দেখতে।

স্থানীয়দের উদ্যোগে একপর্যায়ে বাজারের বটগাছের নিচে তাঁর জন্য তৈরি করা হয় টিনের এক চালা ছোট্ট একটি ঘর। সেই ঘরই এখন তাঁর স্থায়ী ঠিকানা।

বয়সের ভারে বর্তমানে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা অনেক কমে গেছে। দিনের বেশিরভাগ সময় শুয়ে থাকেন। কথা বলতে পারেন খুব সামান্য। তবে স্থানীয় কয়েকজন মানুষ নিয়মিত তাঁর খাবার ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর দেখভাল করেন।

পরিচয় জানতে চাইলে প্রতিবেদকের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে শুধু বলেন, ‘ময়না’। এরপর আর কোনো কথা বলেননি।
তাঁর নীরবতার বিপরীতে সাজিউড়া বাজারে তাঁকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্প ও বিশ্বাস।

স্থানীয়দের একটি অংশ তাঁকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখেন এবং তাঁকে ঘিরে এলাকায় নানা বিশ্বাস ও জনশ্রুতি রয়েছে। তাঁদের দাবি, তাঁর সান্নিধ্যে এসে অনেকে মানসিকভাবে শান্তি পেয়েছেন এবং বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়েছেন। তবে এসব বিশ্বাস ও দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সাজিউড়া গ্রামের বাসিন্দা ও তাঁর ভক্ত আজহারু ইসলাম বলেন, “খালার সান্নিধ্যে এসে অনেক মানুষ উপকার পেয়েছেন বলে আমরা দেখেছি। শুধু আমাদের এলাকা নয়, দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ তাঁকে দেখতে ও দোয়া চাইতে আসেন। আমরা কয়েকজন মিলে তাঁর দেখাশোনা করি।

তিনি জানান, মানুষের ভিড় বাড়তে থাকায় স্থানীয় ভক্তদের উদ্যোগে তাঁর অবস্থানের কাছাকাছি এক টুকরো জায়গা কেনা হয়েছে। সেখানে ভবিষ্যতে তাঁকে দাফন করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ জন্য স্থানীয়রা অর্থ সংগ্রহ করে সবকিছু প্রস্তুত করে রেখেছেন বলে জানান তিনি।

আজহারু ইসলাম আরও বলেন, “প্রতি বছর ১০ মহররম তাঁর অবস্থানস্থলে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তিনি মুর্শিদি ও মারফতি গান পছন্দ করেন। তাঁর আগ্রহে স্থানীয় বাউল শিল্পীদের নিয়ে মাঝেমধ্যে ছোট পরিসরে গানের আয়োজন করা হয়। বর্তমানে তাঁর প্রয়োজনের বিষয়গুলো দেখাশোনার জন্য কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি রয়েছেন এবং তাঁদের একজন প্রবীণের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁরা কাজ করেন বলে জানান আজহারু ইসলাম।

সাজিউড়া বাজার ছাড়িয়ে ‘সাজিউড়ার খালা’কে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এখন আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ তাঁকে দেখতে আসেন বলে স্থানীয়রা জানান।

তবে এত বছর পরও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর অজানাই রয়ে গেছে, কোথা থেকে এসেছিলেন তিনি? তাঁর পরিবার-পরিজন কোথায়? কেনই বা তিন দশকের বেশি সময় ধরে সাজিউড়া বাজারকেই নিজের ঠিকানা করে নিলেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো আর কখনো জানা যাবে না।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাজার বদলেছে, মানুষের জীবনযাপন বদলেছে। বদলায়নি বটতলার ওই বৃদ্ধাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মায়া, শ্রদ্ধা ও কৌতূহল।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে সাজিউড়া বাজারের বটতলায় বসবাস করা ময়না, স্থানীয়দের কাছে ‘সাজিউড়ার খালা’। তাঁর পরিচয় আজও রহস্যে ঢাকা, আর সেই রহস্যই তাঁকে ঘিরে তৈরি করেছে সাজিউড়া বাজারের এক জীবন্ত গল্প।

স্থানীয় বাসিন্দা ও কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, গীতিকবি আব্দুল হাই সেলিম বলেন, “বহু বছর ধরে তিনি আমাদের সাজিউড়া বাজারে বসবাস করছেন। বাজারের সবাই তাঁকে ‘খালা’ বলে সম্বোধন করেন এবং অত্যন্ত স্নেহ ও মমতার সঙ্গে দেখেন।

সময়ের সঙ্গে তিনি আমাদের এলাকার মানুষের আপনজনের মতো হয়ে উঠেছেন। শুধু স্থানীয় মানুষই নয়, তাঁর সম্পর্কে জানতে ও তাঁকে একনজর দেখতে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেক মানুষ এখানে আসেন।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর