
শাহরিয়ার মিল্টন,শেরপুর : বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে কফি অত্যন্ত জনপ্রিয় পানীয়। অর্থকরী ফসল হিসেবে কফির খুব কদর রয়েছে। আমাদের দেশেও এখন কফির চাহিদা ব্যাপক। চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ কফি আমদানি করা হয়। অথচ আমাদের দেশেও কফি চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। শেরপুরের কৃষিতে কফি চাষের উজ্জল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
গারো পাহাড় এলাকায় এ ফসল যেন এক নতুন অতিথি হিসেবে এসেছে। এই অঞ্চলে কফি চাষ নিয়ে ব্যাপক আশাবাদী কৃষকরা। কাঙ্খিত ফলন ও বাণিজ্যিক পথ সুগম হলে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে যাবে বলে জানান এলাকার কফি চাষীরা ।
উদ্যোক্তা কৃষিবিদ সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে কফির চারা বিতরণ করছেন। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা এসে কফি গাছের চারা নিয়ে যাচ্ছেন। এতে লাভের আশায় কৃষকরাও দারুনভাবে খুশি হচ্ছেন।
কৃষি অফিস, উদ্যোক্তা ও চাষীরা জানান, পৃথিবীতে ৬০ প্রজাতির কফি থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে দুই রকমের কফির চাষ রয়েছে।
এই এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য এরাবিকা ও রোবাস্টা জাতের কফি চাষ শুরু হয়েছে। রোবাস্টা জাতের কফি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বেশি উপযোগী। যে কারনে জেলার পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়ায় এর সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। কফির চারাগুলো দেখতে কিছুটা দেবদারু চারার মতো। মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে প্রতিটি পরিপক্ব গাছে ফুল ধরা শুরু হয়।
মে থেকে জুন মাসের মধ্যে ফুল থেকে গুটি গুটি ফলে পরিণত হয়। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ফল পরিপক্বতা লাভ করে। পরে এগুলো রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। বাজারজাত ও কফি পান করার জন্য উপযোগী করতে মেশিনের মাধ্যমে কফিবীজ গুঁড়া করে নিতে হয়। আবার কফির বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা যায়। ফলন ভালো হলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছ প্রতি ৫/৭ কেজি কফি পাওয়া সম্ভব বলে জানা গেছে।
প্রতি কেজি কফির দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা। প্রতি একরে ২৫০টি থেকে ৩০০ টি গাছ লাগানো যায়। সেই হিসেবে বছরে ২শ কফি গাছ থেকে ১ হাজার ৬শ কেজি পর্যন্ত কফি ফলন পাওয়া যায়। যার ন্যূনতম বাজারমূল্য ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
বর্তমানে এই কফি চাষে নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা করছেন কৃষিবিদ সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ। তিনি একটি বেসরকারী কোম্পানীতে চাকরীর সুবাদে বান্দরবন জেলায় প্রজেক্ট ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এমতাবস্থায় রুমা উপজেলার ডার্জিলিং পাড়ায় কফি চাষ প্রথমে তার নজরে আসে। সেখান থেকেই কফিচাষ নিয়ে গবেষনা শুরু করেন কৃষিবিদ সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ। ২০২১ সালে লাল লিয়াং বং এর বাগান থেকে ৫ কেজি কফি কিনে চারা উৎপাদন করেন।
সেই চারা পরীক্ষামূলকভাবে পাশ্ববর্তী হালুয়াঘাট, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় এবং বান্দরবানের কিছু চাষীদের মাঝে বিতরণ করেন। এরপর আবার ২০২২ সালে আরো কিছু কফির চারা বিতরন করেন। সেই চারাগুলো থেকে পরিপুর্ণভাবে এখন ফল দেয়া শুরু করেছে। ওইসব কফি সংগ্রহ করে অল্প কিছু ফল নিজস্ব মেশিনে রোস্টিং করে বাজারজাত করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তা কৃষিবিদ সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ জানান, বাংলাদেশে কফি চাষ সম্প্রসারণ ও বাণিজ্যিকিকরণের লক্ষে এই অঞ্চলে গারো পাহাড়ে প্রচুর অব্যবহৃত জমিকে চাষের আওতায় আনতে আগামী দুই বছরে প্রায় দুই লাখ চারা বিনামুল্যে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই পর্যন্ত ৬৩ জন চাষীর মাঝে প্রায় ২০ হাজার চারা বিনামুল্যে বিতরণ করেছেন। এই চারাগুলো আগামী দুই বছরের মাথায় ফল দেয়া শুরু করবে। এছাড়া তিনি কফি চাষীদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চারা রোপন ও পরিচর্যা বিষয়ে অবহিত করছেন।
একই সাথে সহায়ক হিসেবে একটি করে বই দিচ্ছেন। তিনি আরো জানান, কফি চাষে বাড়তি কোন জমি লাগে না। বাড়ীর যে কোন বাগানে সাথী ফসল হিসেবে ছায়াযুক্ত জায়গাতে কফি চাষ করে বাড়তি আয় করছেন চাষীরা। উৎপাদিত কফি বিক্রি করার জন্য কৃষকদের কোথাও যেতে হচ্ছে না। তিনি নিজেই ন্যায্য মূল্যে কফি কিনে নিচ্ছেন। এতে কৃষকরা বাজারজাতকরণ ও সঠিক দাম পেয়ে চাষীরা খুশি। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও এই কফি রপ্তানী করবেন।
কেন বিনামূল্যে কফির চারা বিতরণ করেন এমন প্রশ্নে উদ্যোক্তা কৃষিবিদ সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ বলেন, নতুন ফসল হিসেবে কৃষকরা ঝুঁকি নিতে চান না। তাই তিনি নিজ উদ্যোগে চাষীদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিনামূল্যে চারা বিতরণ করছেন। এই চারাগাছ থেকে যখন কফি উৎপাদন শুরু হবে তখন তিনি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে কফি ক্রয় করে বাজারজাত করবেন।
নালিতাবাড়ী উপজেলার বিন্নিবাড়ী গ্রামের চাষী বুলবুল আহাম্মেদ বলেন, আমি ২শ চারা নিয়েছি। আমার একটি লিচু ফলের বাগান আছে সেই বাগানের ছায়ায় এই কফি গাছের চারা রোপন করবো। রামচন্দ্রকুড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন বলেন, দুই বছর আগে আমি ৫৪ টা চারা লাগিয়েছিলাম। এ বছর ৫০ টি গাছে ফল ধরেছে। আমি আরো কফি চারা লাগানোর জন্য প্রস্ততি নিচ্ছি।
নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, উপজেলার গারো পাহাড় এলাকার মাটিতে অম্লত্ব ও উর্বরতা শক্তি কফি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। বৃষ্টিপাত ও মাটির গঠন বিন্যাস মিলে এই উপজেলায় কফি চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্যোক্তার সাথেও আমাদের যোগাযোগ আছে। আমরা এ ব্যাপারে কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ ও সহযোগিতা করে যাচ্ছি।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
জেলা ইমাম সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত
জেলা ইমাম সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত
সাপাহারের সন্তান মাহমুদুস সালেহীনকে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি করায়...
সাপাহারের সন্তান মাহমুদুস সালেহীনকে কেন্দ্রীয় যুবদলের...
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের মাসিক সভা জুন-২০২৬ অনুষ্ঠিত
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের মাসিক সভা জুন-২০২৬...
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ওমর ফারুকের...
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা...
খাগড়াছড়িতে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
খাগড়াছড়িতে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের –...
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন...