
মজিবুর রহমান,নেত্রকোনাঃ ঐতিহ্য, গৌরব ও কৃতিত্বের দীর্ঘ ইতিহাস বুকে ধারণ করে আছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা। উপমহাদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব প্রতিটি অধ্যায়ে এই জনপদের কৃতি সন্তানরা রেখেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তবুও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও মন্ত্রিসভায় কাঙ্ক্ষিত প্রতিনিধিত্ব না পাওয়া এবং উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে অবহেলার অভিযোগ আজও ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হচ্ছে স্থানীয়দের কণ্ঠে।
ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত ভারতের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে কেন্দুয়ার নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে গেছেন নলিনী রঞ্জন সরকার। তাঁর প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক দক্ষতা উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
পাকিস্তান আমলে একই উপজেলার আরেক কৃতি সন্তান ড. হাফিজুর রহমান খাদ্য, কৃষি, বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অবদান প্রমাণ করে, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতায় কেন্দুয়া কখনো পিছিয়ে ছিল না।
স্বাধীন বাংলাদেশেও এই জনপদের গৌরবময় উপস্থিতি ছিল সুস্পষ্ট। দেশের প্রধান বিচারপতি এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কেন্দুয়ারই সন্তান শাহাবুদ্দিন আহমেদ। তাঁর নেতৃত্বে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আস্থার বার্তা পেয়েছিল। এতে কেন্দুয়ার মানুষ গর্বের সঙ্গে বিশ্বাস করতে শিখেছিল, তাদের জনপদ ইতিহাসের সাক্ষীই নয়, ইতিহাস নির্মাতাও।
রাজনীতি ছাড়াও সাহিত্য-সংস্কৃতির ভুবনেও কেন্দুয়া সমৃদ্ধ। লোকসাহিত্যের নিবেদিত সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে, নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, মরমি সাধক জালাল উদ্দীন খাঁ, বাউল শিল্পী আব্দুল মজিদ তালুকদার, সাহিত্যিক যতীন সরকার ও কবি রওশন ইজদানী-সহ অসংখ্য কৃতি ব্যক্তিত্ব এই জনপদের সন্তান।
তাঁদের সৃষ্টিশীল অবদান দেশের শিল্প-সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। বহু প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দ্বায়িত্ব পালন করছেন। এত গৌরবময় ইতিহাস থাকার পরও দীর্ঘ সময় ধরে মন্ত্রিসভায় কেন্দুয়ার প্রতিনিধিত্ব অধরাই রয়ে যাওয়ায় আক্ষেপ বইছে স্থানীয়দের।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বলিষ্ঠ ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ আলহাজ্ব ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর কেন্দুয়া-আটপাড়ার মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে এবং মন্ত্রিসভায় স্থান পাবে এই জনপদের প্রতিনিধি। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
শুধু মন্ত্রিসভায় উপেক্ষিত হওয়াই নয়, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ক্ষেত্রেও কেন্দুয়া দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার বলে অভিযোগ রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছায়নি। উপজেলার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সড়ক এখনো কাঁচা, যা বর্ষা মৌসুমে চলাচলের জন্য চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে প্রতিনিয়ত বাধার মুখে পড়তে হয়।
শিল্প, সাহিত্য ও ক্রীড়া বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিবেশও গড়ে ওঠেনি বলেই মনে করেন সচেতন মহল। একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স, মানসম্মত খেলার মাঠ কিংবা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অভাব তরুণ প্রজন্মের বিকাশকে সীমিত করছে। বহু মৌলিক উন্নয়ন সূচকেও পিছিয়ে রয়েছে এ উপজেলা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন! যে জনপদের সন্তানেরা বারবার দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছে, সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ করেছে, সেই জনপদ কেন উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপেক্ষিত থাকবে?
তবে হতাশার মাঝেও আশাবাদ রয়েছে। ইতিহাসের গৌরব ও কৃতিত্বই কেন্দুয়ার মানুষের প্রেরণা। তাদের প্রত্যাশা, একদিন এই জনপদের যোগ্য নেতৃত্ব জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ স্বীকৃতি পাবে এবং উন্নয়নের ধারায় নতুন গতি সঞ্চার হবে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এ জনপদবাসীর একটাই দাবি গৌরবের সঙ্গে যেন যুক্ত হয় প্রাপ্য উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বের।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
জেলা ইমাম সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত
জেলা ইমাম সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত
সাপাহারের সন্তান মাহমুদুস সালেহীনকে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি করায়...
সাপাহারের সন্তান মাহমুদুস সালেহীনকে কেন্দ্রীয় যুবদলের...
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের মাসিক সভা জুন-২০২৬ অনুষ্ঠিত
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের মাসিক সভা জুন-২০২৬...
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ওমর ফারুকের...
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা...
খাগড়াছড়িতে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
খাগড়াছড়িতে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের –...
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন...